আলোকিত রাঙামাটি
ব্রেকিং:
নানিয়ারচরে দুই সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে যুবক নিহত তিন পার্বত্য জেলায় নিয়োগ তত্ত্বাবধান করবে মন্ত্রণালয়
  • শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ১০ ১৪২৮

  • || ১০ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
রাঙামাটিতে করোনায় নতুন আক্রান্ত আরো ৩ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছেন- ১৪৩৬, মোট মৃত্যু ১৭ জন। মোট ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়েছে- ৩২,১৪৭ জনকে।

ইউপি সদস্যকে হত্যার নেপথ্যে সন্দেহের তালিকায় পিআইও নুরুন্নবী

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২১  


বাঘাইছড়ি প্রতিনিধিঃ- রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে ইউপি সদস্য সমর বিজয় চাকমাকে গুলি করে হত্যার তিন সপ্তাহ পার হলেও হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উন্মোচন হয়নি। হত্যার ঘটনায় নামীয় দশজনসহ ১৮ জনকে আসামী করে মামলা হয়। তবে সুমন চাকমা নামে একজন ছাড়া পুলিশ জড়িত কাউকে শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে পারেনি। এছাড়া তদন্ত কার্যক্রমে পুলিশের গুরুত্ব না থাকায় জড়িতরাসহ মূল পরিকল্পনাকারী হত্যার ঘটনাটি ভিন্ন দিকে প্রবাহিতের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন সমর বিজয়ের স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা বলছেন, অফিসে ঢুকে প্রকাশ্যে সমর বিজয়কে হত্যার ঘটনাটি পরিকল্পিত। এই হত্যার নেপথ্যে পিআইও নুরুন্নবী সরকারকে সন্দেহের চোখে দেখছেন তার পরিবারসহ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

আগে থেকেই প্রকল্প নিয়ে দ্বন্দের জেরে সমর বিজয়ের সাথে তর্কবিতর্কসহ ঝগড়া ছিলো নুরুন্নবীর। ঘটনার দিন সকালেই পিআইও নুরুন্নবী মোবাইল ফোনে সমরকে অফিসে ডেকে নেওয়ার পরেই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয় বলেও অভিযোগ তাদের। সাক্ষাৎকারে সমর বিজয়ের হত্যায় ঘটনায় পিআইও নুরুন্নবীর জড়িত থাকার বিভিন্ন বিষয়ের বর্ননা দেন পরিবারের সদস্য ও সংগঠনের নেতারা। 

সমর বিজয় চাকমার পরিচয় : 
নিহতের পরিবার এবং তাঁর সংগঠনের সাথে কথা বলে জানা যায়, দুই সন্তানের জনক নিহত সমর বিজয় চাকমা (৩৮) বাঘাইছড়ি উপজেলার রুপকারী ইউনিয়নের মগবান এলাকার মৃত নির্মল কান্তি চাকমার ছেলে এবং একই ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য ছিলেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (এমএন লারমা) এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন সংগঠনের উপজেলা শাখার ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক।

হত্যা ঘটনার দিনই ঘটনার প্রতিবাদে দীঘিনালায় একই সংগঠনের পক্ষ্য থেকে বিক্ষোভ সমাবেশ করা হয়। সমাবেশে উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক সমীর চাকমা তাঁর বক্তব্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘পাহাড়ে কোন সরকারী অফিসের ভিতরে স্বশস্ত্র সন্ত্রাসী ঢুকে কাউকে হত্যার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। তাছাড়া উপজেলা সদরে দিনদুপুরে এ ধরনের ঘটনা কল্পনা করা যায়না।’ সমীর চাকমা প্রশ্ন রেখে আরো বলেন, ‘সমর বিজয় চাকমা পিআইও অফিসে পৌছার ৫-৮ মিনিটের মধ্যে সেখানে হত্যাকারী স্বশস্ত্র অবস্থায় ঢুকলো। কিন্তু প্রতিপক্ষ্যের সন্ত্রাসীদের অবস্থান স্থল থেকে উপজেলা সদরে পৌঁছতে কমপক্ষ্যে ২০-২৫ মিনিট সময় লাগার কথা। তাহলে সমর বিজয় পিআইও অফিসে আসার আগেই হত্যাকারীদের সে খবর জানানো হয়েছিল।’

জেএসএস (এমএনলারমা) বাঘাইছড়ি উপজেলা শাখার জ্ঞানজীব চাকমা বলেন, গত বছরের ২৫মার্চ রাতে রুপকারী ইউনিয়নের মগবান এলাকায় নিজ ঘরে ঢুকে সমর বিজয় চাকমার বড় ভাই ভূষন চাকমা ওরফে দুদর্ব চাকমাকে (৪৩) গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষের  জেএসএস (সন্তু) স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। ভূষন চাকমার অপরাধ তিনি ছিলেন জেএসএস (এমএনলারমা) সমর্থীত যুব সংগঠন যুব সমিতির সদস্য। অথচ সমর বিজয় চাকমাকে হত্যার সময় তাঁর সাথে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কক্ষ্যে আরো ৩জন যুব সমিতির সদস্য ছিলেন। তাঁরা হলেন, বিনয় মেম্বার (৩৫), রিকেল চাকমা (২৫) ও পান্ডব চাকমা (২৮)। তাহলে ওই ৩ জনকে হাতের নাগালের মধ্যে পেয়েও প্রতিপক্ষ কোন ক্ষতি না করে শুধু সমর বিজয় চাকমাকে হত্যা করে গেল। আর পিছন থেকে গুলি করলো, হত্যাকারি পিছন থেকে সমর বিজয়কে চিনলও কিভাবে। এছাড়া উপজেলা পরিষদে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেহরক্ষি হিসেবে অস্ত্রধারী আনসার ভিডিপি’র সদস্য নিয়োজিত ছিলেন। এমন অবস্থায় শুধু সমর বিজয়কে হত্যা করা নিয়ে নীল নকশা ছিল বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন ওই নেতা।

প্রকল্প নিয়ে ঝগড়া ছিল প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে : 
নিহত সমর বিজয় চাকমার স্ত্রী ববিতা চাকমা (৩৫) বরেন, প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করার পরও বিল না দেওয়ার কারণে প্রায় সময়েই প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে ঝগড়া হতো সমর বিজয় চাকমার। মোবাইল ফোনে ঝগড়া করার ঘটনা অনেক দিন তিনি নিজেই শুনেছেন। এছাড়া বিল না পাওয়ার কারণে ঋন পরিশোধ করতে না পেরে ঝামেলায় ছিলেন বলেও স্ত্রীর সাথে আলোচনা করেতন। 

ববিতা চাকমা আরও জানান, সমর বিজয় একটু প্রতিবাদি ধরনের ছিলেন, তাই অন্যান্য মেম্বারের সমস্যাগুলো নিয়েও তিনিই প্রতিবাদি হয়ে কথা বলতেন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সাথে। হত্যাকান্ডের ঘটনার দুইদিন আগে সোমবারে (২২ ফেব্রুয়ারী) বিলের জন্য সমর বিজয়সহ কয়েকজন মেম্বার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে সেখানে কর্মকর্তার সাথে কথা কাটাকাটি হয়। পরে কর্মকর্তা তাদের বুধবারে অফিসে যেতে বলেন। সে অনুযায়ী বুধবারে সকালে নাস্তা (টিফিন ভাত) না করেই অফিসে যান, ফিরে এসে নাস্তা করার কথা ছিল। ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় তিনি ফোন দিয়ে জানতে চাইলে পিআইও এখনো অফিসে আসেননি; আসলে কাজ সেরে ঘরে ফিরে নাস্তা করবেন বলে জানিয়েছিলেন স্ত্রীকে। সে নাস্তা করা আর হয়নি, ফিরেছেন লাশ হয়ে। প্রসঙ্গতঃ পাহাড়ি সম্প্রদায় সকালে নাস্তা করেননা, সাড়ে১০টা-১১টার দিকে ভাত খান; সেটিকে তাদের ভাষায় বলা হয় ‘টিফিন ভাত’। 

ববিতার চাওয়া :
স্বামী হারিয়ে দুই সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে এখন তিনি অন্ধকার দেখছেন জানিয়ে করুন কণ্ঠে জানান, সম্প্রতি সময়ে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে মাঠকর্মী হিসেবে চাকুরীর জন্য একটি আবেদন করেছেন। সরকারের দয়ায় সে চাকুরীটি হলে তাঁর দুই সন্তানের পড়া-লেখার ভবিষ্যত চিন্তা অনেকটা দুর হয়ে যেত। এ জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের সহানুভূতি কামনা করেছেন।

হত্যা মামলার বাদি বিনয় মেম্বার : 
হত্যাকান্ডের ঘটনার সময় সমর বিজয় চাকমার চেয়ার লাগোয়া সামনের চেয়ারে বসা ছিলেন বাঘাইছড়ি (সদর) ইউপির ৯নম্বর ওয়ার্ড সদস্য বিনয় চাকমা। বিনয় চাকমা জানান, সোমবারে পিআইও’র সাথে প্রকল্পের বিল নিয়ে কথা কাটাকাটি হলে বুধবারে তাদের অফিসে যেতে বলেন। সে অনুযায়ী বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সমর বিজয়ের বাইকে চড়ে দু’জনেই পিআইও অফিসে যান। তখনো পিআইও অফিসে আসেননি। পিআইওকে তারা ফোন দিলে অফিসে আসতে আরেকটু বিলম্ব হবে জানিয়ে তিনি অফিসে এসে তাদের ডেকে নিবেন বলে জানান। এর পর তারা দু’জনেই চলে আসেন বাজারে। বাজারে বিনয় কিছু কেনাকাটাও করেন। এর পর সোয়া ১২টার দিকে বিনয়ের মোবাইলে পিআইও ফোন দিয়ে তাদের অফিসে যেতে বলেন। এর ১৫-২০ মিনিট পর রিকেল চাকমা ও পান্ডব চাকমা দুইজন সঙ্গীকে নিয়ে সমর ও বিনয় অফিসে যান। সামনের চেয়ারে বিনয়, পিছনের চেয়ারে সমর এবং বাম পাশের চেয়ারে বসেন পান্ডব আর বাহিরে জানালায় দাঁড়িয়েছিলেন রিকেল। তাঁরা বসার পরও বিল নিয়ে পিআইও’র সাথে কথা কাটাকাটি চলছিল। পিআইও’র চেয়ার ছিল দরজা মুখি, সামনে টেবিল। তখন পিআইও টাচফোন হাতে টিপছিলেন। এর ৫ থেকে ৮ মিনিটের মধ্যেই গুলির শব্দ। বিনয়ের ভাষ্য অনুযায়ী পিআইও তখন চেয়ার ঘুরিয়ে বাম পাশে তাকিয়ে থাকেন। যা রহস্যজনক বলে দাবী বিনয়ের।

প্রত্যক্ষর্শী রিকেল চিনেছেন হত্যাকারীকে :
রিকেল চাকমা (২৮) বলেন, ঘটনার সময় তিনি পিআইও’র কক্ষের দিকে তাকিয়ে বাহিরের জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হত্যাকারী মনিময় চাকমাকে (৪১) তিনি চিনতে পেরেছেন। কারণ ঘটনার সময় মনিময়ের মুখোশ পরা ছিলনা। এছাড়া বাঘাইছড়ি উপজেলার কাচালং নদীর এপারে খেদারমারা ইউনিয়নের উত্তর পাবলাখালি গ্রামের বাসিন্দা রিকেল আর নদীর ওপারে সরবতলি ইউনিয়নের মেদিনিপুর গ্রামের বাসিন্দা মনিময়। একসাথে খেলাধুলা আর পড়ালেখায় বড় হয়েছেন তাঁরা। কিন্তু রাজনীতির আদর্শে এখন তারা প্রতিপক্ষ। দুইজন দুই আঞ্চলিক দল জেএসএস (এমএন লারমা) এবং জেএসএস (সন্তু) পক্ষ্যের সাথে সম্পৃক্ত।

রিকেল আরো বলেন, মাটি রংয়ের ফুলহাতা শার্ট এবং থ্রিকোয়অর্টার প্যান্টপরা মনিময়ের হাতে ছিল ক্লোজবাট একে-৪৭ রাইফেল । দরজার সামনে প্রথম চেয়ারেই বসা ছিল সমর বিজয়। বন্দুকের নল সমর বিজয়ের পিঠে ঠেকিয়ে নিচের দিকে নল তাক করে দুইটি গুলি করে দ্রুত কক্ষ্য থেকে বেরিয়ে যায় হত্যাকারি মনিময়। বন্দুকের নল সামনের দিকে তাক করে গুলি করলে সামনের চেয়ারে বসা বিনয় এবং তাদের সামনে থাকা পিআইও গুলিবিদ্ধ হতেন। অতর্কিত ঘটনায় হতবাক হয়ে তারা নিজেরাও পিআইও’র কক্ষ্য থেকে ছাদে চলে যান। তখন দেখতে পান নিচে দাঁড়িয়ে থাকা অপর অস্ত্রধারী (একে-৪৭) ফাঁকাগুলি ছুঁড়ে দ্রুত দুই অস্ত্রধারীই অস্ত্র হাতে নিয়েই বাইকে করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। তারা দুইজন ব্যাতিত বাইকের চালক ছিল আরেকজন।

গুলির শব্দে ভিতরে অবস্থান নেয় ইউএনও’র দেহরক্ষী :
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দেহরক্ষী আনসার ভিডিপি’র সদস্য মো. শাহীন স্বশস্ত্র অবস্থায় সেদিন ডিউটিতে ছিলেন। শাহীন জানান, ঘটনার সময় নির্বাহী কর্মকর্তার দরজায় ছিলেন তিনি। গুলির শব্দ পেয়ে ভিতরে ঢুকে পাশেই কোথাও গুলি হওয়ার বিষয়টি নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। তখন নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁকে দরজা আটকিয়ে কক্ষের ভিতরে দরজায় অবস্থান নিতে বলেন। সে অনুযায়ী তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘হটাৎ গুলির শব্দ শোনার পর আমি এবং আমার কক্ষে থাকা অন্যদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দেহরক্ষীকে দরজা আকটিয়ে দরজার ভিতরে অবস্থান নিতে বলি।

সরেজমিনে দেখা যায়, উত্তরমুখি পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা উপজেলা পরিষদ ভবন। সিঁড়ি দিয়ে দ্বিতীয় তলায় উঠার পর ডানপাশে (পূর্বদিকে) প্রথম কক্ষটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। আর বাম পাশে (পশ্চিম দিকে) ৩টি কক্ষের পর শেষপ্রান্তে ৪র্থ কক্ষটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়।

তবে এ বিষয়ে  প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. নুরুন্নবী সরকার বলেন, প্রকল্প নিয়ে কারো সাথে আমার ঝগড়া নেই, সমর আঞ্চলিক দলের কোন্দলের কারণে খুন হয়েছে ।

মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সাইদ আসাদ বলেন, বিষয়টি তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আমরা প্রাপ্ত তথ্য যাচাই বাছাই করে দেখছি। তাছাড়া অবৈধ মোটর বাইকের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যাবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। আর তদন্তের স্বার্থে এর বেশি বলা যাচ্ছেনা।’ তবে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি হতে পারে টার্গেট কিলিং।

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি