আলোকিত রাঙামাটি
ব্রেকিং:
করোনায় দীর্ঘ ১৩৭ দিন বন্ধ থাকার পর খুলল রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্স
  • বুধবার   ০৫ আগস্ট ২০২০ ||

  • শ্রাবণ ২১ ১৪২৭

  • || ১৪ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

সর্বশেষ:
রাঙামাটির উপজেলা ভিত্তিক করোনা আপডেটঃ- রাঙামাটি সদর- আক্রান্ত ৪৩৫, কাপ্তাই- আক্রান্ত ১০২, কাউখালী- আক্রান্ত ৩০, বাঘাইছড়ি- আক্রান্ত ১৫, বরকল- আক্রান্ত ০৫, লংগদু- আক্রান্ত ১৫, রাজস্থলী- আক্রান্ত ১০, বিলাইছড়ি- আক্রান্ত ১৩, জুরাছড়ি- আক্রান্ত ২৩, নানিয়ারচর- আক্রান্ত ০৯। মোট আক্রান্ত- ৬৫৭, মোট সুস্থ- ৪৯৩, মোট মৃত্যু- ১০ জন।
১৮৮

ইলিশ আহরণে ছাড়াবে রেকর্ড, অপেক্ষা আর দু-একদিন

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ১ আগস্ট ২০২০  


সমুদ্রে ইলিশ মাছ ধরার ওপর আরোপিত দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে প্রায় এক সপ্তাহ হলো। বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। দু-একদিনের মধ্যেই ট্রলারভর্তি মাছ নিয়ে ফিরে আসবেন তারা। জেলেদের ফিরে আশার অপেক্ষায় আছেন আড়তদার, মহাজন এবং জেলে পরিবারের লক্ষাধিক সদস্য।

অভিজ্ঞতার আলোকে মৎস্য বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন, এবার জেলেদের জালে বেশি এবং বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়বে। কারণ এ বছর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা ৬৬ দিন বরিশাল-ঢাকা নৌপথে বন্ধ ছিল লঞ্চ চলাচল। নদীর তীরবর্তী অনেক শিল্পকারখানাও বন্ধ ছিল এ সময়। ফলে বাতাসে দূষণের মাত্রা কমে যায়। যান্ত্রিক নৌযান চলাচল এবং বেশিরভাগ শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় বরিশাল বিভাগের নদ-নদীর পানিও অনেক কম দূষণ হয়। এসব কারণে সাগরেও দূষণ কমে। অনেকটা অবাধে নদ-নদী ও সমুদ্রে বিচরণ করতে পারে ইলিশ। পাশাপাশি বেড়ে ওঠার পর্যাপ্ত সময়ও পায়। তাই এবার ইলিশের বংশবৃদ্ধি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়াবে— এমনটি মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাগরের আবহাওয়াও এ বছর বেশ ভালো রয়েছে। বৃষ্টি হওয়া এবং তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রির আশপাশে থাকার মানে হলো, জালে ইলিশ ধরা পড়ার আদর্শ আবহাওয়া। এসব দিক বিবেচনা করে ইলিশ উৎপাদনে আশার আলো দেখছেন বাংলাদেশ মৎস্য অধিদফতর, মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং মাছবিষয়ক সংস্থাগুলোর গবেষক ও জেলেরা।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, এবার ইলিশের উৎপাদন ছাড়িয়ে যাবে অতীতের সব রেকর্ড।

উপকূলের নদ-নদীতে ইলিশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দেশের আট জেলায় ‘ইকো ফিশ’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে মৎস্য অধিদফতর। এর আওতায় ইলিশের বংশবিস্তার, প্রজননকাল নির্ধারণসহ নানা দিক নিয়ে গবেষণা করা হচ্ছে। ‘ইকো ফিশ’ প্রকল্পের সহযোগী গবেষক বলরাম মহালদার বলেন, ‘জেলে, যান্ত্রিক নৌযান ৬৬ দিন বন্ধ এবং লকডাউনের কারণে তখন বায়ুর পাশাপাশি জলও হয়ে উঠেছিল নির্মল। দূষণের মাত্রাও কমে গিয়েছিল। এই দূষণমুক্ত পরিবেশ ইলিশদের বংশ বিস্তারে সহায়ক হয়েছে। নির্বিঘ্নে সাঁতার কেটেছে মাছেদের দল। দূষণ কমেছে সাগরের জলেও। তাই প্রজননের ঋতুতে মিষ্টি ও দূষণহীন জল পেয়ে ইলিশের ঝাঁক বেশি আসবে। গত বছরের চেয়ে এবার বেশি ইলিশ উৎপাদন হবে বলে আশা করছি। তাই, লকডাউন বেশকিছু মানুষের কাছে অভিশাপ হলেও ইলিশ শিকারীদের কাছে আশীর্বাদ হতে পারে।’

ইলিশের এই গবেষক আরও বলেন, এখন নিম্নচাপের কোনো সতর্কবার্তা নেই। সেজন্য মৎস্যজীবীরা গত ২৩ জুলাই গভীর রাত থেকেই সমুদ্রের দিকে যেতে শুরু করেন। আবহাওয়া অনুকূল থাকলে দু-তিনদিনের মধ্যেই বাজারে চলে আসবে বঙ্গোপসাগরের রুপালি ইলিশ। আমরা আশাবাদী, মৎস্যজীবীরা এবার বড় সাইজের এবং প্রচুর পরিমাণ ইলিশ ধরে ফিরবেন।

 

ilsha

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আলিপুর-মহিপুর বেসরকারী মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের আড়তদার শাহ আলম জানান, সাগরে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ ছিল। বেকার হয়ে পড়েছিল মৎস্যজীবী ও বন্দরের কয়েক হাজার শ্রমিক। তবে ২৩ জুলাই রাত থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। ইঞ্জিনচালিত নৌযান নিয়ে সাগরে মাছ শিকারে গেছেন কয়েক হাজার জেলে। এখন তাদের ফেরার অপেক্ষা শুধু।

আড়তদার শাহ আলম জানান, উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১০০ আড়ত আছে। লাভের আশায় মৎস্য খাতে লাখ লাখ টাকা লগ্নি করেছেন এখানকার শত শত আড়তদার-মহাজন। পাশাপাশি মৎস্যজীবী ও বন্দরের কয়েক হাজার শ্রমিকের পরিবার তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। সবার একটাই আশা, ট্রলারভর্তি করে জেলেরা ইলিশ নিয়ে ফিরবেন।

আড়তদার শাহ আলম বলেন, সাগরে ইলিশ শিকারে যাওয়া কয়েকজন জেলের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে। তারা জানিয়েছেন, দু-তিন ধরে তারা সাগরে জাল ফেলে প্রচুর ইলিশ পাচ্ছেন। ইলিশ নিয়ে দু-একদিনের মধ্যেই তারা ফিরবেন।

মৎস্য অধিদফতরের বরিশাল জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তা (ইলিশ) ড. বিমল চন্দ্র দাস জানান, সাগরে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন, অভয়াশ্রমগুলোতে জাটকা ধরা বন্ধ এবং নিষিদ্ধ সময়ে মা ইলিশ ধরা বন্ধের কারণে ইলিশের উৎপাদন দিনে দিনে বেড়েছে। তবে এবার করোনার কারণে টানা ৬৬ দিন বরিশাল-ঢাকা নৌপথে বন্ধ ছিল লঞ্চ চলাচল। দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমের চারটি বরিশাল বিভাগে। ওই সময়ে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় অভয়াশ্রম চারটিসহ বিভাগের বিভিন্ন নদ-নদীতে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ অবাধে বিচরণ করতে পেরেছে। পাশাপাশি লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় পানিতে দূষণ কমেছে। সাগরেও দূষণ কমেছে। এতে ইলিশের বংশবিস্তার ও প্রজননসহ সবকিছুই বাড়বে বলে ধারণা করছি।

‘শুধু তাই নয়, হারিয়ে যাওয়া দেশীয় প্রজাতির অনেক মাছই আবার নতুন করে নদীতে ফিরে এসেছে। অভিজ্ঞতা বলছে, এবার বেশি ইলিশ পাওয়া যাবে। আমাদের ধারণা ইলিশ উৎপাদনে এবার বিগত দিনের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।’

ড. বিমল চন্দ্র দাস জানান, কয়েক বছর ধরেই দেশের মোট ইলিশের ৬৬ ভাগের বেশি আহরিত হচ্ছে বরিশাল বিভাগ থেকে। এ বিভাগ থেকে গতবার আহরিত হয়েছিল তিন লাখ ৩২ হাজার ২৫ মেট্রিক টন। বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইলিশের জোগান দেয় ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী। বিভাগে জেলের সংখ্যা তিন লাখ ৫২ হাজার ৭২৪ জন। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ জেলের বসবাস ভোলা, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলায়। ওই তিন জেলার বেশির ভাগ জেলে সাগর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর প্রায় ১০ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌযানে সাগরে গেছেন অর্ধ লক্ষাধিক জেলে। এখন তাদের ইলিশ নিয়ে ফেরার পালা। এছাড়া ট্রলারমালিক, শ্রমিক ও পাইকারসহ মৎস্য ব্যবসা সংশ্লিষ্ট কয়েক লাখ মানুষের আয়ের অন্যতম উৎস ইলিশ ঘিরেই। তাই ইলিশ উৎপাদন বেশি হলে এর সুফল পাবেন তারা।

 

ilsha-1

বরিশাল পোর্টরোড আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অজিত কুমার দাস মনু জানান, মোকামে ইলিশের সরবারহ বেড়েছে। দুই সপ্তাহ আগে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ মণের মতো ইলিশ আমদানি হতো। সেখানে গত এক সপ্তাহে ইলিশ আমদানি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত ৪৫০ মণের বেশি ইলিশ আমদানি হয়েছে। তবে সাগরের ইলিশ এখনও আসতে শুরু করেনি। সাগর থেকে জেলেরা ফিরতে শুরু করলে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ ইলিশ আমদানির আশা করছি।

তিনি আরও জানান, ইলিশের মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। তবে উজানে নদ-নদীতে প্রচুর স্রোত বইছে সাগরের দিকে। স্রোতের বাধার কারণে ইলিশ নদীতে আসতে পারছে না। এ কারণে নদ-নদীতে ইলিশ তেমন মিলছে না। সাগরের মোহনায় ইলিশ মিলছে। সামনে পূর্ণিমার জো। এরপর থেকে নদ-নদী ও সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছি। তখন দামও কমে যাবে।

দামের বিষয়ে অজিত কুমার দাস মনু জানান, বৃহস্পতিবার পোর্ট রোড মোকামে দেড় কেজি সাইজের ইলিশের মণ বিক্রি হয়েছে ৪৫ হাজার টাকায়। সে হিসাবে প্রতি কেজি ইলিশের পাইকারি দাম পড়ে এক হাজার ১২৫ টাকা। এক কেজি সাইজের ইলিশের মণ বিক্রি হয়েছে ৩৬ হাজার টাকায়। সে হিসাবে প্রতি কেজির দাম পড়েছে ৯০০ টাকা। রফতানিযোগ্য এলসি আকারের (৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম) প্রতি মণ ২৮ হাজার টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি ইলিশের পাইকারি দাম পড়ে ৭০০ টাকা। হাফ কেজি বা ভেলকা আকারের (৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম) ২৪ হাজার টাকা। কেজিপ্রতি এই ইলিশের পাইকারি দাম পড়ে ৬০০ টাকা। গোটরা আকারের (২৫০ গ্রাম থেকে ৩৫০ গ্রাম) প্রতি মণ ১৬ হাজার টাকা, কেজিপ্রতি পাইকারি দাম দাঁড়ায় ৪০০ টাকায়। জাটকা প্রতি মণ পাইকারি বিক্রি হয়েছে ১৪ হাজার টাকায়। সে হিসাবে প্রতি কেজি জাটকার পাইকারি দাম পড়ে মাত্র ৩৫০ টাকা।

মৎস্য অধিদফতর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক আজিজুল হক জানান, নিরাপদ প্রজননে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ায় প্রতি বছরই ইলিশের উৎপাদন বাড়ছে। দেশে এবার এক লাখ মেট্রিক টন ইলিশ বেশি আহরণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগেই ৬০ থেকে ৭০ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ বেশি আহরিত হবে বলে আশা করছি।

সাগর কিংবা নদী, যেখানেই ধরা পড়ুক না কেন, এই মৌসুমে ইলিশ উৎপাদন বাড়বে জানিয়ে আজিজুল হক আরও বলেন, দেশে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট ইলিশ আহরিত হয় পাঁচ লাখ ১৭ হাজার ১৮৮ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে তা আরও বাড়বে। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছর ইলিশ উৎপাদনে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। দেশে এবার ছয় লাখ মেট্রিক টনের বেশি ইলিশ আহরিত হবে বলে আশা করছি।

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর