আলোকিত রাঙামাটি
ব্রেকিং:
‌‌কাপ্তাই হ্রদের মাছ উৎপাদনের হারিয়ে যাওয়া গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে : মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম
  • শনিবার   ৩১ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১৬ ১৪২৭

  • || ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সর্বশেষ:
রাঙামাটিতে মোট করোনায় আক্রান্ত- ৯২৯, মোট সুস্থ- ৯০২, মোট মৃত্যু- ১৪ জন।
৩৬৮

করোনা মোকাবেলায় বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যসেবা দর্শন

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ৩০ এপ্রিল ২০২০  

ছবি- সংগৃহীত


সম্ভবত সচেতন সব মানবগোষ্ঠী অবগত আছেন, সমাজ-সভ্যতার ক্রমবিকাশের আধুনিক ধারায় দর্শন শাস্ত্রের আদি জনক ছিলেন মহাজ্ঞানী সক্রেটিস। তার সূচিত দর্শনের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ প্রক্ষালিত হয়েছিল তারই সুযোগ্য শিষ্য প্লেটোর দার্শনিক ভাবধারায়, যা অদ্যাবধি কারও পক্ষে অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।

এ জন্যই আধুনিক দার্শনিক এমএন হোয়াইটহেডের মন্তব্য ছিল, ‘প্লেটোর পর দর্শনশাস্ত্র বিন্দুমাত্র অগ্রসর হয়নি। এ যাবৎ কেবল প্লেটোর দর্শনের টীকাভাষ্য রচনা হয়েছে মাত্র।’ আরেক দার্শনিক ইমারসন বলেছেন, ‘দর্শন বলতে যেমন প্লেটোকেই বুঝতে হবে, তেমনি প্লেটো বলতেও বুঝতে হবে দর্শন।’

ইতিহাস পর্যালোচনায় আমরা জানি, বিশ্বের আর্তমানবতার সেবা প্রদানের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান রেডক্রস সমিতির প্রতিষ্ঠাতা হেনরি ডুনান্ট ছিলেন পিতা প্রদত্ত একজন উচুঁ মার্গের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। কিন্তু সর্বদা মানুষের দুঃখ-কষ্টে অপরিসীম মমতায় তার হৃদয় ভারাক্রান্ত থাকত।

জনাব ডুনান্ট ১৮৫৯ সালে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হাজার হাজার সৈন্যের প্রাণহানির সংবাদে ফ্রান্সের সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত বৈঠকে যোগ না দিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। স্বচক্ষে দেখেন ভয়ংকর দৃশ্য- সারি সারি মৃতদেহ, আহত সৈন্যদের বাঁচার আর্তনাদ ও হাহাকার।

নিহত সৈনিকদের সৎকার এবং আহত সৈনিকদের চিকিৎসাসেবায় মনোনিবেশ করে ১৮৬৩ সালে জেনেভা শহরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন এবং গঠন করেন সেবাদান সংস্থা ‘রেডক্রস’। পবিত্রতার সাদা আর রক্তের লাল রঙে খচিত হল সংস্থার প্রতীক।

একইভাবে আর্তমানবতার সেবায় জীবন উৎসর্গকারী বিশ্বনন্দিত মহীয়সী রমণী ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল। ১৮৫৩ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যুদ্ধাহত সৈনিকদের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশায় তাদের সেবা প্রদানে নিজেকে অবিচল নিবেদন করে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন সমগ্র বিশ্বে।

এ রকম বহু ঘটনা রয়েছে, যারা সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্ব মানবতার জয়গানে ভাস্বর হয়েছেন এবং মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিরঞ্জীব মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মানবকল্যাণে আত্মত্যাগ সভ্যতার ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালের ৮ অক্টোবর পিজি হাসপাতালের রক্ত সংরক্ষণাগার এবং নতুন মহিলা ওয়ার্ডের উদ্বোধন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ভাষণের প্রায়োগিক পরামর্শ ছিল- ‘সেবার মনোভাব নিয়ে মানুষকে সেবা করুন’।

ভাষণের শুরুতে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট মহাবিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. নুরুল ইসলামের বারণ সত্ত্বেও অনুষ্ঠানে যোগদানের পটভূমি ব্যাখ্যা করেন বঙ্গবন্ধু। অত্যন্ত আনন্দচিত্তে এ ধরনের সেবার প্রয়োজন, আয়োজন ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আপনারা শিক্ষিত, বুদ্ধিজীবী, আপনারা দেশের মানুষ, আপনারা জানেন দেশের অবস্থা কী। স্বাধীনতা সংগ্রামে বিভিন্ন স্তরের লোক যেমন জীবন দিয়েছে, ডাক্তাররাও তেমন দিয়েছে। এ পর্যন্ত যে নাম আমরা পেয়েছি তাতে দেখা যায় ৫০ জন ডাক্তারকে শহীদ হতে হয়েছে। ৫০ জন ডাক্তার তৈরি করতে কী লাগে আপনারা জানেন।

দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা যায়, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রেও ডাক্তারদের হত্যা করা হয় না। দু’পক্ষে যখন যুদ্ধ হয়, দুই দেশে যখন যুদ্ধ হয়- এতে ডাক্তাররা যুদ্ধবন্দি হয়ে পড়লে তাদের হত্যা করা হয় না, এমনকি খারাপ ব্যবহারও করা হয় না। কিন্তু পাকিস্তানি নরপশুরা এত বড় পশু যে তারা আমার ডাক্তারদের ধরে নিয়ে হত্যা করেছে। ৫০ জনের তালিকা পাওয়া গেছে।

ডাক্তার ইসলামকে আমি বলেছি পিজি হাসপাতালের দেয়ালের কাছে পাথরে এসব ডাক্তারের নাম ও ইতিহাস লিখে রাখুন। যাতে প্রত্যেক ডাক্তার দেখে যে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের দান কতখানি। এর ফলে বোধহয় দেশের জনগণের প্রতি তাদের দরদ বাড়বে।’

করোনার মতো দুর্যোগ-তাণ্ডবে বিশ্ব হাহাকারের নির্মমতা বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিলেন। বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্র বা পুঁজিবাদ নয়, জনগণের একনায়কতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র কায়েমে দৃঢ়ব্রতী হয়ে দীপ্তকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমি এই দুঃখী মানুষের নেতা; আমি নেতা হয়েছি, ওরা আমাকে নেতা বানিয়েছে, বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের সঙ্গে আমি থাকব।’

বঙ্গবন্ধু সেই ভাষণে অর্থবিত্তের প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা করে বলেন, এর সঙ্গে আরও অতীব প্রয়োজনীয় বিষয় হচ্ছে মানবতাবোধ। কী অসাধারণ বিনয়ের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার মনে হচ্ছে, আপনারা বেয়াদবি মাফ করবেন, আমরা যেন মানবতা বোধ হারিয়ে ফেলেছি। পয়সা কোনো জায়গায় কম দেয়া হচ্ছে না। ভিক্ষা করে হোক পয়সা এনে দেয়া হচ্ছে।

কিন্তু জাতীয় চরিত্র আমাদের নষ্ট হয়ে গেছে। ... আমি যেদিকে চাই সেদিকে ‘মানুষ’ খুব কম দেখি। মানুষ এত নীচ হয় কী করে? মানুষ মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে পয়সা নেয় কী করে? মানুষ গরিব-দুঃখীর কাছ থেকে কী করে লুট করে, আমি বুঝতে পারি না।”

তিনি আরও বলেন, ‘এত রক্ত, ৩০ লক্ষ লোকের জীবন, এত শহীদ, এত মায়ের আর্তনাদ, এত শিশুর আর্তনাদ, এত বাপ-মায়ের ক্রন্দন, দেয়ালে দেয়ালে রক্তের লিখা, রাস্তায় রাস্তায় রক্তের স্বাক্ষর- আর সেইখানে বসে সরকারি কর্মচারীরা যদি টাকা-পয়সা খায়, তাদের জীবন নিয়ে যদি ছিনিমিনি খেলে, এ দুঃখ বলার জায়গা কোথায় আছে, আমাকে বুঝিয়ে বলুন। আইন দিয়ে তো এটা করা যাবে না। এটা মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তনের দরকার, মনের পরিবর্তনের দরকার। মানবতা বোধ জাগ্রত হওয়ার দরকার।’

আবেগতাড়িত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু ডাক্তারদের উদ্দেশে বলেন, ‘যেখানেই যান দেখবেন সবকিছু বাংলাদেশের দুঃখী মানুষের পয়সায় গড়া। তাদের দিকে কেন নজর দেবেন না। সাদা কাপড়-চোপড় দেখলেই কেন তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেন? আর দুঃখী মানুষ এলেই কেন তাকে রাস্তায় বাইর করে দেন, বয় বলে চিৎকার করেন? এই মনোভাবের পরিবর্তন কবে আপনাদের হবে! আমি শুধু আপনাদের ডাক্তার সাহেবদের বলছি না।

এটা যেন আমাদের জাতীয় চরিত্রের মধ্যে এসে গেছে। এ জাতীয় চরিত্রের প্রতি চরম আঘাতের প্রয়োজন আছে। ... আপনাদের কাছে আমি সেই জন্য আবেদন করব যে, আপনাদের মানবতা বোধ দরকার, মনুষ্যত্ব থাকা দরকার, সততা থাকা দরকার- না হলে কোনো জাতি কোনোদিন বড় হতে পারে না।

আপনারা শুধু নিজেকে অপমান করছেন না, অপনারা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে অপমান করছেন। এবং আপনারা অপমান করছেন- যারা মারা গিয়েছে সেই শহীদদের আত্মাকে।’

বঙ্গবন্ধুর সেই অমিয় দর্শনকে ধারণ করে আজ বাংলার সর্বস্তরের স্বাস্থ্যসেবীরা মরণঝুঁকির বিনিময়ে করোনা প্রতিরোধে, আক্রান্তদের সেবা এবং সতর্কতা-সচেতনতা নির্মাণে অনবদ্য ভূমিকা পালন করে চলেছেন। ইতোমধ্যেই ডা. মঈন করোনাযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। তেজোদীপ্ত বঙ্গকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।

করোনাযুদ্ধে জয়ী হওয়ার কঠিন সংকল্প নিয়ে ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান প্রস্তুতি গ্রহণ, বিশেষ প্রণোদনা প্রদান, প্রচণ্ড শক্তিময়তায় শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব এবং মনোবল বৃদ্ধিতে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধকরণ, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-বেকারত্ব-মন্দা ইত্যাদিকে জয় করার মহান বার্তা পুরো বাঙালি জাতিকে করেছে পরিপূর্ণ আশ্বস্ত।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি
সম্পাদকীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর