আলোকিত রাঙামাটি
  • শনিবার   ১৫ মে ২০২১ ||

  • জ্যৈষ্ঠ ১ ১৪২৮

  • || ০২ শাওয়াল ১৪৪২

সর্বশেষ:
রাঙামাটিতে করোনায় নতুন আক্রান্ত আরো ২ জন। মোট আক্রান্ত হয়েছেন- ১৪৭৪, মোট সুস্থ- ১৪৩৫, মোট মৃত্যু ১৭ জন।

করোনা ভাইরাস

কাপ্তাইয়ে ঘরোয়া ভাবে পালিত হবে নববর্ষের অনুষ্ঠান

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০২১  

ফাইল ফটো 

নজরুল ইসলাম লাভলু (কাপ্তাই) প্রতিনিধি:- পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়ী সম্প্রদায়ের অন্যতম সামাজিক অনুষ্ঠান বৈসাবী। চাকমা সম্প্রদায়ের বিজু, মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাঁই, তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের বিষু, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু নামে পরিচিত হলেও সকল উৎসবের আদ্যাক্ষর দিয়েই বৈসাবী। তবে সকলে বর্ষ বিদায় এবং নববর্ষকে বরন উপলক্ষে এই উৎসব গুলো পালন করে থাকেন। কিন্ত করোনা ভাইরাসের কারনে এবারও কাপ্তাইয়ে হচ্ছে না প্রাণের বৈসাবী উৎসব। প্রতিবছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে পাহাড়ের এই উৎসব উদযাপনে ব্যস্ত থাকতো পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। কি শহর, কি গ্রাম, প্রতিটি এলাকায় হতো বর্নিল এই উৎসবের আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, র‍্যালি, পাজন ও পিঠা পায়েস রান্না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজনে মুখরিত থাকতো পাহাড়ের প্রতিটি জনপদ। মহামারী করোনা পরিস্থিতিতে গতবছরের  মতো এবারও বড়সড় উৎসব বাদ দিয়ে একান্ত ঘরোয়াভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে এই উৎসব পালন করবেন এখানকার বসবাসরত পাহাড়ী জনগণ। 

কাপ্তাই উপজেলায় বসবাসরত পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ট হলো মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়।

কাপ্তাইয়ের চিৎমরম, ওয়াগ্গা, রাইখালী ও কাপ্তাই ইউনিয়নের হরিনছড়ায় মারমা সম্প্রদায়ের বসবাস। এই উপজেলার চিৎমরমে রয়েছে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধ বিহার চিৎমরম কিয়াং। প্রতিবছর এখানকার মারমা জনগোষ্ঠী ১৫ এপ্রিল পালন করে থাকে সাংগ্রাই জল উৎসব যা জলকেলী উৎসব নামে পরিচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ১৪ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিল চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার মাঠে বসতো বৈশাখী মেলা, হতো ঐতিহ্যবাহী মারমা সম্প্রদায়ের নাচ, গান, খেলাধুলা। উৎসবকে কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক ছুটে আসতো এবং উপভোগ করতো এই আয়োজন। এমনকি বিদেশী অনেক পর্যটকও এই উৎসবে যোগ দিতো, কিন্ত করোনার মহা থাবায় গত বছরের মতো আয়োজক কমিটি এবছরও সমস্ত উৎসবের আয়োজন বাতিল করেছেন।

চিৎমরম সাংগ্রাই জল উৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক ক্যাপ্রু চৌধুরী সদস্য সচিব পাই সিং মং মারমার সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, তাদের সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিলো, কিন্ত করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক জনসমাগম এড়াতে তারা এবছরও তাদের উৎসব বড়পরিসরে না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তবে কিয়াংয়ে  তারা স্বাস্থ্য বিধি মেনে ছোট পরিসরে পুজা দিবেন এবং পরিবার পরিজন নিয়ে ঘরে বসে এই উৎসব পালন করবেন। মারমা সংস্কৃতি সংস্থার ( মাসস)  কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক চিৎমরমের বাসিন্দা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মংসুইপ্রু মারমা, চিৎমরমের বাসিন্দা মাসাথুই মারমা, নাইম্রাচিং মারমা জানান, সাংগ্রাই তাদের প্রাণের উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে কত প্রস্তুতি থাকতো তাদের, কিন্তু করোনার কারনে তারা এবছরও এই আনন্দযজ্ঞ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 

অপরদিকে, কাপ্তাইয়ে বসবাসরত তনচংগ্যা সম্প্রদায় তাদের অন্যতম সামাজিক উৎসব বিষুকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজনে মুখরিত রাখতো তাদের প্রতিটি পল্লী। এই উৎসবকে ঘিরে ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়াতে অনুষ্ঠিত হতো ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়ে বিষু র‍্যালি, গ্রামীণ খেলাধুলা, পাজন রান্না, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন। এই সম্প্রদায়ের ১২ এপ্রিল ফুল বিষুর দিন নদী বা ছড়ায় ফুল ভাসানো হতো, ১৩ এপ্রিল মূল বিষু, এবং ১৪ এপ্রিল নববর্ষ।  এদিন তারা সকালে মন্দিরে গিয়ে সমবেত প্রার্থনার মাধ্যমে জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করে। এছাড়া সকলে এদিন পাজন, বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও যার যার সামথ্য অনুযায়ী বিভিন্ন উপাদেয় খাবার রান্না করে এবং একে অপরকে আপ্যায়ন করাতো। কিন্ত এবারেও করোনার কারনে তাদের সমস্ত কর্মসূচী বাতিল করা হয়েছে বলে ওয়াগ্গা মৌজার হেডম্যান অরুণ কুমার তালুকদার জানান। তিনি জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত মোতাবেক তারা এবছর জনসমাগম হয়, এমন অনুষ্ঠান হতে বিরত থাকবেন, তবে পরিবার পরিজন নিয়ে তারা ঘরে বসেই এই উৎসব পালন করবেন। ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা তনচংগ্যা গানের শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার সুর্য্যসেন তনচংগ্যা জানান, প্রতিবছর বিষু এলে নতুন নতুন গান রচনা করতেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এসব গান পরিবেশন করা হতো। কিন্ত করোনার কারনে তারা এবারও এই উৎসব করতে পারছেনা বড় পরিসরে।

ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা জনপ্রিয়  বেতার ও টিভি শিল্পী জ্যাকলিন তনচংগ্যা জানান, প্রতিবছর বৈসাবিতে বিভিন্ন খেলা, সংগীতানুষ্ঠান হতো। কিন্তু গতবছর  কোনো অনুষ্ঠান হয়নি এবং এবছরেও হবেনা। এনিয়ে ছোটো এবং বড়দের মধ্যে দুঃখের শেষ নেয়।

শুধুমাত্র পাহাড়ী জনগোষ্ঠী নয, নববর্ষকে কেন্দ্র করে কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসন, বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জেম ঘাঁটি, বিজিবি, সেনাবাহিনী, কেপিএম, কাপ্তাই উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি, চন্দ্রঘোনা চম্পা কুঁড়ি খেলাঘর আসরসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা আয়োজন করে থাকতো। কিন্ত করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এবছর সমস্ত আয়োজন বাতিল করেছেন সংশ্লিষ্টরা। "আবার জমবে মেলা, হাট খোলা বটতলা" আবার আসবে দিন- সুদিন, যেদিন করোনা মুক্ত হবে এই ধরনী, সকলের এটাই প্রত্যাশা।

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি