আলোকিত রাঙামাটি
ব্রেকিং:
রাঙামাটির সাজেকে সড়ক দূর্ঘটনায় আহত দুইজনকে হেলিকপ্টারে ঢাকায় প্রেরণ
  • বৃহস্পতিবার   ২৯ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ১৪ ১৪২৭

  • || ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সর্বশেষ:
রাঙামাটিতে মোট করোনায় আক্রান্ত- ৯২৭, মোট সুস্থ- ৮৮৭, মোট মৃত্যু- ১৪ জন।
৩৩০

ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধু

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২০  

খেলোয়াড়দের মাঝে বঙ্গবন্ধু


হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছিলেন একাধারে সফল রাষ্ট্র নায়ক, খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক। দেশের সব বিষয়ে ছিল তার সমান দৃষ্টি। তিনি ক্রীড়াঙ্গনেও রেখে গেছেন অনন্য অবদান। 

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও বেগম সাহেরা খাতুনের ঘর আলো করে জন্মগ্রহণ করেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।

পারিবারিকভাবেই বঙ্গবন্ধু খেলাধুলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুর বাবা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন ফুটবলার। পেশায় তিনি গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের সেরেস্তাদার ছিলেন। তবে গোপালগঞ্জের প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়মিত ফুটবল খেলতেন তিনি। গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাব দলটির অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতেন লুৎফর রহমান। অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

স্কুলে পড়া অবস্থায় ফুটবলে হাতে খড়ি হয় বঙ্গবন্ধুর। ১৯৩৭ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল মিশন স্কুলের ফুটবল দল। স্কুল দলের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। স্কুল দলের হয়ে বাবার বিপক্ষে বেশ কয়েকবার ফুটবল ম্যাচ খেলেছেন বঙ্গবন্ধু। গোপালগঞ্জ অফিসার্স ক্লাবের বিপক্ষে ৫টি ড্র আছে শেখ মুজিবুর রহমানের দল মিশন স্কুলের, যা তিনি নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। উৎসুক জনসাধারণ বাবার বিপক্ষে তার খেলা বেশ উপভোগ করতেন। 

ঢাকার ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে ১৯৪০ সালের শুরুর দিকে মাঠ মাতাতেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৩-৪৪ মৌসুমে বগুড়ায় আয়োজিত গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে তার নেতৃত্বে চ্যাম্পিয়ন হয় ওয়ান্ডারার্স ক্লাব। এই ক্লাবের হয়ে ফুটবলের পাশাপাশি ভলিবল, বাস্কেটবল এবং হকিতে মাঠে নেমেছেন তিনি। বেশ কিছুদিন ক্লাবটির সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। এছাড়া ধানমন্ডি ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্গবন্ধু, যা বর্তমানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ নামে পরিচিত। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এটি শিক্ষা-সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও বর্তমানে সংস্থাটি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রনালয়ের অধীনস্থ। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের ৪৩টি ভিন্ন ভিন্ন ক্রীড়া সংস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। 

১৯৭২ সালেই দেশের ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) গঠন করেন বঙ্গবন্ধু। ঠিক দু’বছর পরেই বাফুফে পেয়ে যায় ফিফা ও এএফসির সদস্যপদ। দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি) যা বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নামে পরিচিত, এটাও ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এই মহানায়ক। 

 

১৯৭৩ সালে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো নামে একটা ক্লাব ঢাকায় খেলতে আসলে বঙ্গবন্ধু তার কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে ভিআইপি গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করেন

 

ফুটবল, ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য খেলা যেমন হকি, ভলিবল, বাস্কেটবল, দাবা, কাবাডি, জুডো-কারাতেসহ সব খেলাকেই সমান প্রাধান্য দিতেন বঙ্গবন্ধু। 

ক্রীড়ার মান উন্নয়নে ক্রীড়া অবকাঠামোর সুবিধাদি এবং সঠিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন বঙ্গবন্ধু। ক্রীড়া প্রতিভা শনাক্ত করণ, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পরিচর্যার পাশাপাশি যোগ্য প্রশিক্ষক এবং ক্রীড়া বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে পারবে এসব কথা মাথায় রেখে ১৯৭৪ সালে বিশেষ ধরণের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে লক্ষ্যে তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় প্রকল্প আকারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব স্পোর্টস (বিআইএস) প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন।

১৯৮৩ সালে বিআইএস সরকারী থেকে স্বায়ত্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তখন এর নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) রাখা হয়। ১৯৮৬ সালের ১৪ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়।

ফুটবলের প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের ছিলো অন্যরকম ভালোবাসা। সুযোগ পেলেই তিনি খেলা দেখতে মাঠে চলে যেতেন। ফুটবলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার স্মৃতিচারণ করেছেন তৎকালীন ফুটবলের মাঠ কাঁপানো খেলোয়াড় কাজী সালাহউদ্দিন।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) বর্তমান সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ। তার হাজারো ব্যস্ততা সত্বেও তিনি আমাদের সময় দিতেন। তার বড় ছেলে শেখ কামাল আমার ক্লাসমেট ছিল। বিকেল বেলা খেলাধুলা শেষে শেখ কামালের সঙ্গে ওদের বাসায় যেতাম। 

সালাহউদ্দিন আরো বলেন, শেখ কামালের নেতৃত্বে আমরা আইএফএ শিল্ড খেলার জন্য ভারত সফরে গিয়েছিলাম। তখন শেখ মুজিবুর রহমান ফোন করে কামালকে বললেন, সব খেলোয়াড়দের জানিয়ে দিও, যদি তোমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারো তাহলে তোমাদের বিমানে করে দেশে নিয়ে আসা হবে। 

একজন প্রধানমন্ত্রীর শত কাজ থাকা সত্ত্বেও তিনি যে খেলার প্রতি এতোটা খোঁজ রাখতেন তা সত্যি বিরল। শুধু তাই নয়, আমরা একবার মালয়েশিয়ায় মারদেকা কাপে খেলতে যাব। তার আগে আমাদের সবাইকে ওনার অফিসে ডেকে চা এবং বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করে বললেন, যাও ভালো করে খেলো। দেশের মান রাখবে কিন্তু।

 

ফুটবলারদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু

 

১৯৭২ সালে কলকাতার মোহনবাগান টিম আমাদেরে সঙ্গে খেলতে ঢাকায় আসে, সেই সময় খেলার আগে মাঠে এসে আমাদের সব খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করেছেন বঙ্গবন্ধু। সেই ম্যাচে আমরা জয় পেয়েছি। ঠিক পরের বছর রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো নামে একটা ক্লাব ঢাকায় খেলতে আসে। সেই ম্যাচের দিন বঙ্গবন্ধু শেখ রাসেলকে সঙ্গে নিয়ে ভিআইপি গ্যালারিতে বসে খেলা উপভোগ করেছিলেন।

সালাহউদ্দিন বলেন, শুধু বঙ্গবন্ধুই নন, তার পুরো পরিবারটিই খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। শেখ কামাল আবাহনী ক্লাব গঠন করার পর বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন, কোন রাজনীতিবিদকে ক্লাবের সঙ্গে জড়িত রাখবে না।

জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান ক্রিকেট বিশ্লেষক রকিবুল হাসান ক্রীড়াঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে বলেন, ক্রীড়াঙ্গনের এমন কোনো শাখা ছিল না, যেখানে জাতির পিতার হাত পড়েনি। শুধু খেলাই না, খেলোয়াড়দের সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। খেলোয়াড় হওয়ার সুবাদে তার সঙ্গে অনায়াসেই আমরা দেখা করতে পারতাম। তিনি সবসময় আমাদের খেলার জন্য উৎসাহ দিতেন। তখনকার সব খেলোয়াড়দের খোঁজ-খবর রাখতেন বঙ্গবন্ধু। 

স্বাধীনতার পর দেশের ক্রীড়া উন্নয়নে বঙ্গবন্ধুর আন্তরিকতার কমতি ছিল না। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপ্রেরণা আর আন্তরিক সহযোগিতায় স্বাধীন বাংলাদেশে ফুটবল মাঠে গড়ায় মাত্র দু’মাসের ব্যবধানে। 

১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। তারকা ফুটবলারদের সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ একাদশ ও রাষ্ট্রপ্রতি একাদশের মধ্যে সেই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সবাইকে নিয়ে গড়া হয়েছিলো বঙ্গবন্ধু একাদশ আর বাছাইকৃতদের নিয়ে রাষ্ট্রপ্রতি একাদশ দল। খেলায় রাষ্ট্রপ্রতি আবু সাঈদ চৌধুরীর দল ২-০ গোলে জয় পেয়েছিল। গোল দুটো করেছিলেন টিপু ও গফুর। সেদিনও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাঠে উপস্থিত ছিলেন। 

মোট কথা আজকের ক্রীড়াঙ্গন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অনন্য। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। 

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি
খেলা বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর