আলোকিত রাঙামাটি
  • মঙ্গলবার   ২০ অক্টোবর ২০২০ ||

  • কার্তিক ৫ ১৪২৭

  • || ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

সর্বশেষ:
রাঙামাটিতে মোট করোনায় আক্রান্ত- ৯২৭, মোট সুস্থ- ৮৮৫, মোট মৃত্যু- ১৪ জন।
২৬০

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

নারীর অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করে চলেছেন তিনি

আলোকিত রাঙামাটি

প্রকাশিত: ৬ জুলাই ২০২০  


নারীর ক্ষমতায়নে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ, যা বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই রোল মডেল। রাজনীতি, প্রশাসন, পররাষ্ট্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রেই নারীর লক্ষণীয় সরব উপস্থিতি। প্রথম নারী স্পিকার, প্রথম নারী উপাচার্য, প্রথম নারী পর্বতারোহী, বিজিএমইএর প্রথম নারী সভাপতিসহ অসংখ্য প্রথম গত এক দশকেই সৃষ্টি হয়েছে। নারীদের এই অভূতপূর্ব ক্ষমতায়ন ও অগ্রগতির পথ তৈরি করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নারীর ক্ষমতায়নের রূপকার তিনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাঙালি নারীদের ক্ষমতায়নের পথিকৃৎ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রের সংবিধানে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সব পর্যায়ে নারীদের সম-অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয় এবং নারী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে রাষ্ট্রের বিশেষ বিধান প্রণয়নের ক্ষমতাও সংযোজন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করেই তাঁর মেয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই সব পর্যায়ে লিঙ্গসমতা, নারীর উন্নয়ন এবং ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করেন এবং বাস্তবিক অর্থে সব পর্যায়ে তা সুসংহত ও কার্যকর করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করেছেন।

নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকার জন্য গত বছর মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে শেখ হাসিনাকে ‘লাইফ টাইম কন্ট্রিবিউশন ফর উইমেন এমপাওয়ারমেন্ট’ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান উইমেন। তিনি স্বাস্থ্য খাতে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিশেষ অবদানের জন্য সাউথ সাউথ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। নারীশিক্ষার উন্নয়ন এবং ব্যাবসায়িক উদ্যোগে ভূমিকার জন্য ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শিক্ষায় নারীদের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা, নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করা, আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নারীদের সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাজনীতিতে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করার জন্য শেখ হাসিনার গৃহীত উদ্যোগ ও সাফল্য অনেক।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধূরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন ধাপে ধাপে এগোচ্ছে। সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। শিক্ষায় নারীর অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান। স্বাস্থ্যে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমেছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। নারীদের মধ্যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সংখ্যা সাত লাখের ওপরে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন অসংখ্য কৃষি উদ্যোক্তাও। রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, পুলিশ, শান্তিরক্ষী বাহিনী—এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীর অংশগ্রহণ নেই। তবে অংশীদারির জায়গা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীদের আরো বহুদূর যেতে হবে।’ 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একজন নারী, বিরোধীদলীয় নেতাও নারী। বাংলাদেশের মানুষ প্রথমবারের মতো একজন নারীকে স্পিকার হিসেবে পেয়েছে। বর্তমানে সংসদ উপনেতা এবং মন্ত্রিসভায় একজন পূর্ণ মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন উপমন্ত্রী রয়েছেন নারী। জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আটজন নারী রাষ্ট্রদূত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।

নির্বাচন কমিশনে প্রথমবারের মতো একজন নারী কমিশনার মিলেছে। দেশের উচ্চ আদালতে বর্তমানে সাতজন নারী বিচারপতি রয়েছেন। বর্তমানে প্রশাসনে সচিব পদে ও সচিব মর্যাদায় ১১ জন নারী কর্মকর্তা আছেন। ছয়জন নারী জেলা প্রশাসক বা ডিসির দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশ সুপার হিসেবেও চার জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন চারজন নারী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ ও তাঁদের কৃতিত্বপূর্ণ অবদান দিন দিন বাড়ছে। শিক্ষাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও নারীর অগ্রগতি অব্যাহত।

রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণকে সুসংহত করার জন্য জাতীয় সংসদে নারী আসনের সংখ্যা ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক নারীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ১২ হাজারের বেশি নারী জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হয়েছে। বর্তমান সংসদে নারী সদস্য আছেন ৭২ জন। তাঁরা দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নারীরা সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সফলতাও দেখাচ্ছে। নারীদের যদি সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে কিভাবে তারা তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করবে?’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নারীদের ওপর আস্থা রেখে দেখেছেন যে নারীরা ভালো করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নারীদের আনছেন। পুরুষ এবং নারী কেউ কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ সফল হতে পারে না। তবে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে নারীরা অনেক ভালো করছে বলে আমার মনে হয়।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় এ বছরের শুরুর দিকে পেশাদার নারী কূটনীতিক নাহিদা সোবহানকে জর্দানে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ দেয় সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনিই প্রথম নারী। শুধু জর্দান নয়, নারী রাষ্ট্রদূতরা সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম, নেপাল, মরক্কো, মরিশাস ও দক্ষিণ কোরিয়ায়। ব্রুনেইয়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হচ্ছেন একজন নারী কূটনীতিক। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী কর্মরত আছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নারী কূটনীতিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রকাশিত বৈশ্বিক লিঙ্গবিভাজন সূচক (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইনডেক্স), ২০১৮ অনুযায়ী বিশ্বে লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশের অবস্থান। এ সূচকে বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৪৮তম। প্রতিবেদন বলছে, এমনটা সম্ভব হয়েছে অর্থনৈতিক সুবিধা ও অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায়। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ও জঁ দ্রজ তাঁদের ‘ভারত : উন্নয়ন ও বঞ্চনা’ (২০১৫ সালে প্রকাশিত) বইয়ে লিখেছেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি অনেক বেশি। তাঁরা দেখিয়েছেন, নারীর সাক্ষরতা এবং শিক্ষায়ও বাংলাদেশ এগিয়ে।

বর্তমানে প্রশাসনে সচিব পদে ও সচিব মর্যাদায় আছেন ১১ জন নারী। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) নারী কর্মকর্তা ফাতিমা ইয়াসমিনকে সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো নারী সচিব পেয়েছে তথ্য মন্ত্রণালয়ও।

মাঠ প্রশাসনে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন ডিসিরা। বর্তমানে ছয়টি জেলায় নারী ডিসি দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের তিনটি জেলায় নারী ডিসি রয়েছেন। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনে প্রায় দেড় শর মতো নারী কর্মকর্তা ইউএনও হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

বিসিএস উইমেন নেটওয়ার্কের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সায়লা ফারজানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রশাসনে পর্যাপ্ত যোগ্য নারী কর্মকর্তা আছেন। বর্তমানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা আছেন। প্রধানমন্ত্রী নারীদের যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ দিচ্ছেন। এ জন্য আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।’

বাংলাদেশের সামরিক ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বর্তমানে নারীর সংখ্যা ২০ হাজারের ওপরে। পুলিশ বাহিনীতে নারী সদস্যের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) গত মার্চ মাসের তথ্যানুযায়ী, সেনাবাহিনীতে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা চিকিৎসকসহ আনুমানিক এক হাজার ৬৫০। মেজর  জেনারেল পদে কর্মরত রয়েছেন একজন। এর আগে কোনো নারী এ পদোন্নতি পাননি। নিয়মিত ফোর্স বা ফাইটিং ফোর্সে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা আনুমানিক ৪০০। তাঁদের কেউ কেউ লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে কর্মরত।

শিক্ষাক্ষেত্রেও এগিয়ে যাচ্ছে নারীরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মেয়েরা আরো কয়েক বছর আগেই ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েও এখন ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছাত্রদের প্রায় সমান। উচ্চশিক্ষায়ও এগিয়ে চলছে নারীরা। বিনা মূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তির আওতা বাড়ানোসহ সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ফলেই মূলত নারীশিক্ষার প্রসার ঘটছে।

সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিকে ছাত্রীর হার প্রায় ৫১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে প্রায় ৫৪ শতাংশ। কলেজে এখন নারীর অংশগ্রহণের হার ৪৮ শতাংশের বেশি। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণের হার ৩৬ শতাংশের একটু বেশি। আর চিকিৎসা, আইনসহ পেশাগত শিক্ষায় নারীরা পুরুষদের ছাড়িয়ে গেছে। পেশাগত শিক্ষায় নারীর হার ৫৪ শতাংশ।

নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবার নারী উদ্যোক্তারা বাংলাদেশ ব্যাংক ও এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক থেকে ১০ শতাংশ সুদে ঋণও নিতে পারছেন। বর্তমানে ৩০ লাখেরও বেশি নারী শ্রমিক পোশাকশিল্পে কর্মরত। ব্যবসায়ে সমান সুযোগ তৈরি করার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে জাতীয় নারী নীতি গ্রহণ করা হয়। দুস্থ, অসহায় ও পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য বর্তমান সরকারের বহুমুখী প্রকল্প চালু আছে।

নারীর প্রতি সব ধরনের সহিসংতা রোধে ২০১২ সালে প্রণয়ন করা হয় পারিবারিক সহিংসতা দমন ও নিরাপত্তা আইন ২০১২। নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রণয়ন করা হয় মানবপাচার প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১২, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১১। বাল্যবিবাহ নিরোধ করে মেয়েশিশুদের সমাজে অগ্রগামী করার জন্য বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়া মেয়েশিশুদের নিরাপত্তায় শিশু আইন ২০১৩ প্রণীত হয়েছে। হিন্দু নারীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার্থে হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে।

আলোকিত রাঙামাটি
আলোকিত রাঙামাটি
রাজনীতি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর