• রাঙামাটি

  •  রোববার, অক্টোবর ২, ২০২২

রাঙ্গামাটি

বিলাইছড়ির অপরুপ স্বর্গপুর ঝর্ণাঃ যেখানে ৭টি ঝর্ণার জলধারা মিশে একাকার

কাপ্তাই প্রতিনিধিঃ-

 প্রকাশিত: ১৫:৩১, ৭ আগস্ট ২০২২

বিলাইছড়ির অপরুপ স্বর্গপুর ঝর্ণাঃ যেখানে ৭টি ঝর্ণার জলধারা মিশে একাকার

​​​​​​​স্বর্গপুর ঝর্ণায় একদল পর্যটক।


বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গ একটি ধর্মীয়, বিশ্বতাত্ত্বিক ও আধিবিদ্যক স্থান। বিশ্বাসীদের মতে যেখানে দেবতা, দেব-দূত, আত্মা জাতীয় সত্তা, সন্ত অথবা পূজিত পিতৃ-পুরুষগণ রাজাসনে অধিষ্ঠিত। বৌদ্ধ ধর্মে ৭টি স্বর্গের কথা বলা হয়েছে। স্বর্গগুলো হল- বসবর্ত্তী স্বর্গ, মহারাজিক স্বর্গ, তাবতিংস স্বর্গ, তুষিত স্বর্গ, যাম স্বর্গ, নির্মাণরতি স্বর্গ, অরুপব্রক্ষা বা মনুষ্যলোক বা মনুষ্য পরিষদ স্বর্গ। এই ৭টি স্বর্গের নামানুসারে বিলাইছড়ি উপজেলার অপরুপ স্বর্গপুরের ৭টি ঝর্ণার নামকরণ করা হয়েছে।

রাঙামাটি জেলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য মণ্ডিত বিলাইছড়ি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২নং ও ৪নং ওয়ার্ডের হাজাছড়া ও দীঘলছড়ি ঢেবারমাথার মাঝামাঝি বিলাইছড়ি পাহাড় ও দীঘলছড়ি পাহাড়ের পাদদেশে ৭টি ঝর্ণা অবস্থিত। যে ঝর্ণা থেকে বছরের প্রতিটি সময় ঝিরিঝিরি শব্দে পানি প্রবাহিত হয়। যেই ঝর্ণার জলরাশি একিভূত হয়ে মিশে গেছে কাপ্তাই লেকের নীল জল রাশিতে। ঝর্ণা হতে বহমান জলধারার সুর লহড়ীতে হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রিতে জাগে নব জাগরণ। যেন স্বর্গের কোন দেবদূত তার অপূর্ব সুরধ্বনি শুনিয়ে যাচ্ছে মেঘমাল্লার কন্ঠে।

শুধু কি ঝর্ণার সৌন্দর্যের দেখা মিলে এই মনোরম স্বর্গপুরে? না, এখানে দু’পাহাড়ের মাঝদিয়ে যে স্বচ্ছ জলস্রোতে দৌত প্রায় দু’কিলোমিটার দীর্ঘ পাথরে আবৃত পথে অবস্থিত রয়েছে ২০টির অধিক প্রাকৃতিক সুইমিং পুল। যে সুইমিং পুলে ভিজে আপনি দেহ মনকে পবিত্রতায় ভরিয়ে তুলতে পারেন।

এসব সুইমিং পুলে রয়েছে অজস্র দৃষ্টিনন্দন নাড়েই মাছ (স্থানীয় নাম) সহ নানা প্রজাতির ছোট মাছ। নাড়েই মাছগুলো পুকুরে চাষ করা মাছের মতই। মানুষ দেখলে খাদ্যের আশায় সামনে এসে জড়ো হয় মাছগুলো। তবে এ মাছ পাড়াবাসীরা ধরে না। যারা ধরবে, প্রমাণ মিললে জরিমানা রয়েছে অনিবার্য। প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এলাকাবাসীর এক সামাজিক বিধান সত্যি প্রশংসনীয়।

অবাক করা বিষয় হল, এই ঝর্ণা গুলোর কোন সুনির্দিষ্ট নাম ছিলনা। সুবিস্তৃত এলাকাটিকে স্থানীয়রা বলে দীঘলছড়ি ঢেবারমাথা। ঢেবা বলতে স্থানীয়রা বুঝে লেকের সেই সরু অংশ যা পাহাড়ের ভিতরদিকে চলে গেছে। ঢেবার মাথা বলতে বুঝায় ঢেবার শেষ প্রান্তকে। কাপ্তাই লেকে এ ধরনের অগণিত ঢেবারমাথা রয়েছে। এটি বিলাইছড়ির দীঘলছড়ি ঢেবার শেষপ্রান্তে। তাই বিস্তৃত এলাকাটি দীঘলছড়ি ঢেবারমাথা হিসেবে পরিচিত। অফিসিয়াল ভাবে আবিষ্কারের পর ঝর্ণা সংশ্লিষ্ট জায়গাটির আলাদা একটি নাম সময়ের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিলাইছড়ি উপজেলার সাবেক উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সুজন কান্তি দাশ ২১ এপ্রিল ২০২০ তারিখ প্রকল্প পরিদর্শন কাজে দীঘলছড়ি ঢেবার মাথায় গিয়ে প্রথম জানতে পেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমানকে জানান যে, সেখানে এরূপ একটি ঝর্ণা রয়েছে। যাতে সারাবছর পানি থাকে। এ তথ্য পেয়ে প্রকৃতিপ্রেমী ও উপজেলার পর্যটন শিল্পে উন্নয়নকামী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ২০২০ সালের ২৩ এপ্রিল (১৪২৮ সালের ১০ বৈশাখ) উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, অফিস স্টাফ ও সাংবাদিক সমেত সেখানে গিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনের পাশাপাশি দিনব্যাপী দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে সেখানকার এই সাতটি ঝর্ণা অফিসিয়ালি আবিষ্কার করেন। ঝর্ণা গুলোর নাম জিজ্ঞেস করে কোন সুনির্দিষ্ট নাম দেয়া হয়নি জানতে পেরে সকল গ্রামবাসিকে নিয়ে একটি মিটিংয়ে বসেন তিনি। মিটিংয়ে গ্রামবাসীর কাছে জানতে পারেন যে ঝর্ণা গুলোর সন্নিকটে যে বৌদ্ধ বিহারটি নির্মিত হচ্ছে তার নাম মনোরম স্বর্গপুর।

এ জায়গায় একসময় এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ধ্যান করত। তাই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সবার কাছেই এটি শ্রদ্ধার জায়গা। সবার মনের এই আবেগের ব্যাপারটি জানতে পেরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রস্তাব করেন ওই বৌদ্ধ বিহারের নামানুসারে স্বর্গের মত সুন্দর এ জায়গাটির নাম হতে পারে স্বর্গপুর এবং বৌদ্ধ ধর্মের সাতটি স্বর্গের নামানুসারে ঝর্ণা গুলোর নামকরণ করা যেতে পারে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের প্রস্তাবে খুশি হয়ে গ্রামবাসী মনোরম স্বর্গপুরের এই সাতটি ঝর্ণার নামকরণ করেন।

এ প্রসঙ্গে বিলাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মিজানুর রহমান জানান, রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় অনেকগুলো ছোট বড় ঝর্ণা রয়েছে, যা দেশের অন্য কোন উপজেলায় নেই। এছাড়া এই উপজেলায় রয়েছে পাহাড় লেক আর সবুজের অনন্য সুসমন্বয়। স্বর্গের মত সুন্দর এ জায়গাগুলোর উন্নয়ন সাধন ও এখানে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠা করে আমরা এখানকার মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন করতে প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

এলাকাবাসী জানান, ওই সাতটি ঝর্ণার আশেপাশে অনেকগুলো ছোট বড় ঝর্ণা রয়েছে। স্থানীয় বরুণ কার্বারী জানান, ঝর্ণা গুলো খুব সুন্দর। এখানে লোকজন আসছে দেখে আমার খুব ভালো লাগছে।

১নং সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুনীল কান্তি দেওয়ান জানান, কিছুদিন আগেও ঝর্ণাগুলো পর্যটকদের কাছে অপরিচিত ছিল। বিলাইছড়ি উপজেলা ইউএনও মহোদয় আসার পর স্থানীয় সাংবাদিকরা পত্র পত্রিকায় লেখালেখির পর এটি এখন ধীরে ধীরে পরিচিতি লাভ করছে।

তিনি আরও জানান, এই এলাকায় আসার পথটুকু খুবই নাজুক। সরকার যদি এই এলাকায় আসার যে পথ আছে সেখানে  রাস্তাঘাট নির্মাণ করে দেয়, তাহলে এই এলাকার পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে। 

রবিবার সকালে ঝর্ণা দেখতে আসা কাউখালী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা এবং তার স্বামী ফটোগ্রাফার ব্যাংকার অহিদুল হাসান জানান, এখানে না আসলে বুঝতে পারতাম না ঝর্ণাগুলো এত সুন্দর। এখানে ঝর্ণার পাশাপাশি অনেকগুলো সুইমিংপুল আছে। এই সুইমিংপুলে ভিজে মনকে হিমশীতল করতে পারাটা অনেক আনন্দের। 

ঝর্ণা দেখতে আসা গাজীপুরের হানিফ মিয়া ও কুষ্টিয়ার সুমন জানান, প্রতিটি ঝর্ণা দিয়ে অবিরাম ধারায় পানি পড়ছে, মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল।

রাঙামাটি সদর কিংবা কাপ্তাই জেটিঘাট হতে ইঞ্জিন চালিত বোটে ঘন্টা দেড়েক পর বিলাইছড়ি উপজেলায় পৌঁছাতে হয়। এরপর বিলাইছড়ি সদর থেকে ধুপ্যাচর, দীঘলছড়ি পার হয়ে ২০ মিনিট ইঞ্জিন চালিত বোটে পাড়ি দিয়ে ঢেবারমাথায় যাওয়া পর আরও ৩০ মিনিট পায়ে হেঁটে এই ঝর্ণায় পৌঁছানো যায়।

১নং সদর ইউনিয়নের এই দুই ওয়ার্ডে যেখানে ঝর্ণাগুলো অবস্থিত সেখানে ৬০টি চাকমা পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা প্রায় ৪শ’। কৃষি জমি চাষ এবং জুম চাষের উপর তাদের জীবন জীবিকা নির্বাহ করে।

বিলাইছড়ি উপজেলার মনোরম স্বর্গপুরের এই ৭টি ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে আগের দিন এসে রাত্রিযাপন করে পরের দিন সকালে ওই এলাকায় গেলে প্রতিটি ঝর্ণার সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করা যাবে। রাত্রি যাপনের জন্য বিলাইছড়ি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়ের সু মনোরম পরিবেশে তৈরী করা হয়েছে নীলাদ্রি রিসোর্ট। এই নীলাদ্রি রিসোর্টে ৫টি কটেজ রয়েছে। কটেজের করিডোরে বসে দূর পাহাড়ের মেঘ বৃষ্টির মিতালী আপনাকে নিয়ে যাবে কল্পনার রাজ্যে। কটেজ সংলগ্ন উপজেলা ক্যাফে ও উপজেলা কেন্টিনে উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বিলাইছড়ি বাজারের আশেপাশে ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে উঠছে অনেক থাকা খাওয়ার ব্যাবস্থা। সবকিছু নিয়ে বিলাইছড়ি উপজেলা এগিয়ে যাচ্ছে পর্যটন শিল্পের বিকাশের দিকে। সবকিছু বিবেচনায় আশা করা যায়, দেশের অনন্য সুন্দর এই উপজেলাটি দেশ বিদেশের পর্যটকদের অনন্য প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে। কৃষি ও প্রাণিসম্পদের পাশাপাশি পর্যটন শিল্প হয়ে উঠবে বিলাইছড়ি উপজেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি।

মন্তব্য করুন: