• রাঙামাটি

  •  শনিবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৩

জাতীয়

সরকার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করছে: প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্কঃ-

 প্রকাশিত: ১০:৩৩, ৫ ডিসেম্বর ২০২২

সরকার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার সরকার পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে প্রতিটি বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক ও সময়োপযোগী যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করছে।

তিনি বলেন, আমরা প্রতিটি বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক এবং সময়োপযোগী যুদ্ধাস্ত্র সংগ্রহ করছি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীকে পেশাদার ও শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি।

রোববার সকালে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) প্যারেড গ্রাউন্ডে ৮৩তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের কমিশন উপলক্ষে আয়োজিত ‘রাষ্ট্রপতি কুচকাওয়াজ-২০২২’-এ যোগ দিয়ে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালে পুনরায় সরকার গঠনের পর প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুগোপযোগী সামরিক বাহিনী গঠনের লক্ষ্যে তার সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাস্তবায়ন করছে। আমরা ‘ফোর্সেস গোল-২০৩০’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করছি। ২০১৬ সালে ‘বাংলাদেশ পিস বিল্ডিং সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছি। জাতির পিতা প্রণীত প্রতিরক্ষা নীতিকে যুগোপযোগী করে ‘জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি, ২০১৮’ প্রণয়ন করেছি। অ্যারোস্পেস ও এভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি।

সরকারপ্রধান বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করতে আমরা সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন, রামুতে ১০ পদাতিক ডিভিশন এবং বরিশালে ৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছি। গত ৪ বছরে বিভিন্ন ফরমেশনের অধীনে ৩টি ব্রিগেড এবং ছোট-বড় ৫৮টি ইউনিট প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। সম্প্রতি মাওয়া-জাজিরাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শেখ রাসেল সেনানিবাস এবং মিঠামইন, রাজবাড়ী ও ত্রিশালে নতুন সেনানিবাস স্থাপনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আর্মি এভিয়েশনের ফরোয়ার্ড বেস এবং লালমনিরহাটে এভিয়েশন স্কুল নির্মাণের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা সেনাবাহিনীতে নতুন কম্পোজিট ব্রিগেড ও প্যারা কমান্ডো ব্রিগেড যুক্ত করেছি। প্রতিটি বাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক এবং যুগোপযোগী অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনটি আপনাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ প্রশিক্ষণের পর কাঙ্ক্ষিত কমিশনপ্রাপ্তির মাধ্যমে আপনারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন গর্বিত অফিসার হিসেবে দায়িত্ব নেবেন।

তিনি বলেন, আজকের এই শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে আপনাদের ওপর ন্যস্ত হলো দেশমাতৃকার মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব আপনারা যথাযথভাবে পালন করবেন বলে আমি আশা করি।

শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে ক্যাডেটদের আগামীতে এগিয়ে যাওয়ায় তিনি ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে পাসিং আউটে ক্যাডেটদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দেন, তার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরেন। জাতির পিতা বলেছিলেন- ‘আমি তোমাদের জাতির পিতা হিসাবে আদেশ দিচ্ছি, তোমরা সৎ পথে থেকো, মাতৃভূমিকে ভালো বেসো। ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াবে, গুরুজনকে মেনো, শৃঙ্খলা রেখো, তাহলে জীবনে মানুষ হতে পারবা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। আমি আশা করি আমাদের নবীন ক্যাডেটরা এই কথা মনে রেখে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি জাতির পিতার রেখে যাওয়া পররাষ্ট্র নীতির প্রসঙ্গে বলেন, আমরা শান্তি চাই, যুদ্ধ চাই না। জাতির পিতাই বলে গেছেন সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয় এবং আমরা তা যথাযথভাবে মেনে চলেই আমাদের দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলে জাতির পিতা বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশে রূপান্তর করে যান। আজকে আমি অন্তত এইটুকু বলতে পারি- আমরা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর ফোর্সেস গোল ২০৩০ বাস্তবায়ন করেছি। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের আর্থসামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্য স্থির করে ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করেছি। সে বছরই বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছে।

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তার সরকার উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চায় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা নতুন কমিশনপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের উদ্দেশে বলেন, আজকে যারা নবীন অফিসার তারাই হবেন আমাদের ‘৪১ এর সৈনিক এবং তারাই এই বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলবেন। লক্ষ্য স্থির রেখে আমরা এগিয়ে যাব।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৭৩ সালে অত্যাধুনিক সুপারসনিক মিগ-২১ যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান, এয়ার ডিফেন্স রাডার ইত্যাদি বিমান বাহিনীতে যুক্ত করেন। তিনি ১৯৭৪ সালেই একটি প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন।

১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নবীন সামরিক অফিসারদের পেশাগতভাবে দক্ষ, নৈতিক গুণাবলী সম্পন্ন এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার দীর্ঘ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেই আওয়ামী লীগ সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে উল্লেখ করে তিনি সে সময় ১৯৯৮ সালে ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ’ এবং ‘মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’, ১৯৯৯ সালে ‘বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস সাপোর্ট অপারেশন ট্রেনিং’ এবং ‘আর্মড ফোর্সেস মেডিক্যাল কলেজ’ প্রতিষ্ঠার কথা জানান।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম সেনাবাহিনীতে দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে মহিলা অফিসার নিয়োগ এবং মহিলা সৈনিক ভর্তির যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হয়।

তার পরিবারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিশেষ যোগসূত্রের কথাও অনুষ্ঠানে স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শেখ কামাল ‘বাংলাদেশ প্রথম যুদ্ধ প্রশিক্ষণ কোর্স’ কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করে প্রধান সেনাপতির এডিসি’র দায়িত্ব পালন করেন। আর শেখ জামাল ছিল সম্মুখযোদ্ধা। ১৯৭৫ সালে জামাল ব্রিটিশ রয়্যাল মিলিটারি একাডেমি, স্যান্ডহার্স্ট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেছিল। রাসেলের ইচ্ছা ছিল বড় হয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার। কিন্তু ঘাতকেরা সকলের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও অত্যাধুনিক একাডেমিতে পরিণত করার লক্ষ্যে তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন ‘বিশ্বের মানুষ একদিন এই মিলিটারি একাডেমিকে দেখতে আসবে।’ উন্নত প্রশিক্ষণ প্রদান ও সুযোগ্য নেতৃত্ব তৈরিতে বঙ্গবন্ধু যে মিলিটারি একাডেমির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তারই বাস্তবায়িত রূপ আজকের এই একাডেমি। এখানে এরই মধ্যে প্রশিক্ষণের সকল প্রকার অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’সহ বিবিধ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী পাসিং আউট ক্যাডেটদের উদ্দেশে আরো বলেন, আজ তোমাদের সুসজ্জিত, সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয় কুচকাওয়াজ দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এজন্য তোমাদের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। নবীন নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং আজকের প্যারেডকে সামগ্রিকভাবে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আমি একাডেমির কমান্ড্যান্ট, সংশ্লিষ্ট সব অফিসার, জেসিও, এনসিও, সৈনিক এবং অসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

দেশ মাতৃকার সেবায় তাদের সন্তানদের দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতিও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৭৫ সালের ১১ জানুয়ারি কুমিল্লা বিএমএতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া অমূল্য ও দূরদর্শী ভাষণটি প্রচার করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বিএমএ প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান, আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড (এআরটিডিওসি) এর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি), বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার এবং ২৪তম পদাতিক ডিভিশন জিওসি এবং বিএমএ কমান্ড্যান্ট তাকে স্বাগত জানান।

প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে সুসজ্জিত অভিবাদন মঞ্চ থেকে অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং চিত্তাকর্ষক কুচকাওয়াজ পরিদর্শন করেন।

খোলা জিপে চড়ে কুচকাওয়াজ পরিদর্শনের সময় তার সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ এবং বিএমএ কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল এস এম কামরুল হাসান।

অনুষ্ঠানে উত্তীর্ণ ক্যাডেটরা আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। সার্বিক বিষয়ে চৌকস সাফল্যের জন্য ৮৩তম বিএমএ দীর্ঘমেয়াদি কোর্সের ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার লাবিব জোহাইর নূর আনান প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘সোর্ড অব অনার’ এবং সেনা বিষয়ে সর্বোচ্চ সাফল্যের জন্য এসএম জহিরুল ইসলাম নিলয় ‘সেনাবাহিনী প্রধান স্বর্ণপদক’ লাভ করেন।

মন্তব্য করুন: