• রাঙামাটি

  •  বৃহস্পতিবার, মে ২৬, ২০২২

পার্বত্য চট্টগ্রাম

পার্বত্য চট্টগ্রামে কেএনএফ নামে নতুন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ

নিউজ ডেস্কঃ-

 প্রকাশিত: ১৬:০১, ১১ এপ্রিল ২০২২

পার্বত্য চট্টগ্রামে কেএনএফ নামে নতুন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আত্মপ্রকাশ

কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট(কেএনএফ) নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক ভয়াবহ সশস্ত্র গোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় অর্ধেক ভূমি নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসন ক্ষমতাসহ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কুকি-চিন রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবীতে সশস্ত্র আন্দোলনে নামতে চলেছে। আসন্ন বর্ষায় তারা আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই সংগঠনের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস বর্ষায় যেকোনো কাজ শুরু করলে তা সফল হয়। তাই তারা আসন্ন বর্ষায় আত্মপ্রকাশ করার পরিকল্পনা করেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্র পার্বত্য নিউজকে জানিয়েছে।

গত ২৪ মার্চ ভারতের মিজোরামে অবৈধ সরঞ্জামসহ এই সংগঠনের ৬ বিচ্ছিন্নতাবাদী উপজাতিকে আটক করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের ১৯৯ নং পারভা ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। এরপরই আলোচনায় আসে সংগঠনটি।

ভারতীয় পত্রিকার সূত্রে খবর, ২৪ মার্চ, ২০২২ বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে বাংলাদেশের রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ট্রাই জংসনের কাছাকাছি ভারতীয় অংশের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মিজোরাম রাজ্যের লংতলাই জেলার পারভা থেকে ঐ ৬ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে করা হয়।


আটকৃতরা হলো, রামডিন্ডলিয়ান (২০) পিতা: লালথান কুং, সাংখুং বম (৩২), লিয়ান বাভিসাং, লালসাংরেম বম (৩৪), লালরাম মাউই (৪৫), নুনসাং বাওম (৩৯)। তারা সকলেই নিজেদের বাংলাদেশের বান্দরবান পার্বত্য জেলার রুমা উপজেলার বাসিন্দা বলে বিএএসফের কাছে পরিচয় দেয়। আটকের পর আসামিদের কাছে থাকা একটি চিঠিতে কুকি-চীন ন্যাশনাল আর্মির সভাপতি এবং চীফ অফ স্টাফের সীলমোহরসহ অন্যান্য উদ্ধারকৃত সরঞ্জামাদি দ্বারা সন্দেহজনক হওয়ায় তাদেরকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএসএফের ১৯৯নং পারভা ব্যাটালিয়ন কমান্ডার।

এসময় তাদের কাছে ১টি, কমান্ডো নাইফ-৩টি ও মোবাইল ফোনসহ অন্যান্য সরঞ্জামাদি ছিলো, যা বিএসএফ জব্দ করে। প্রাথমিকভাবে আটককৃত ব্যক্তিরা বাংলাদেশের বম জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহী সংগঠন কুকি-চীন ন্যাশনাল আর্মির সদস্য বলে ধারণা করা হয়। তবে ভারতীয় গণমাধ্যমে আটককৃতদের কাছে অস্ত্র থাকার কোনো খবর দেয়া না হলেও পার্বত্যনিউজের প্রাপ্ত ছবিতে আটককৃতদের কাছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দেখা গেছে।

বিএসএফ জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আটককৃত ৬ বাংলাদেশী বিচ্ছিন্নতাবাদীকে লংতলাই জেলা পুলিশের কাঝে হস্তান্তর করা হয়েছে।


উল্লেখ্য, কেএনএফের মতে,  বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলা নিয়ে তাদের কল্পিত কুকি-চীন রাজ্য গঠিত। ২০০৮ সালে এই সংগঠনের জন্ম। শুরুতে এ সংগঠনের নাম ছিলো কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও)। বম, পাঙ্খুয়া, লুসাই, খুমী, ম্রো, খিয়াং নামের ছয় জাতি গোষ্ঠী মিলে কেএনএফ গঠিত। তারা নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা মনে করে। একই সাথে চাকমা, মারমাত্রিপুরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে বার্মিজ ও ভারতীয় জাতিভূক্ত এবং বহিরাগত মনে করে। এ কারণে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তাদের বৈরী মনোভাব রয়েছে।


এ সংগঠনের সভাপতি নাথান বম একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন গ্রাজুয়েট, চিত্রশিল্পী ও লেখক। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বান্দরবান থেকে তিনি প্রার্থি হয়েছিলেন।

২০১৬ সালে সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি হয়। শুরুতে এর নাম ছিলো কুকি-চীন ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্স(ৎকেএনভি), বর্তমানে এই সশস্ত্র সংগঠনের নাম কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি(কেএনএ)। প্রথমদিকে তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পরিচালনা করে এবং ভারতের মনিপুর ও বার্মার চীন রাজ্যের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। প্রথম ব্যাচে শতাধিক সদস্যকে মণিপুরে প্রশিক্ষণে পাঠায়। এরপর ১০০ সদস্যকে ভারতের মণিপুর, বার্মার কারেন ও কাচিন রাজ্যে গেরিলা প্রশিক্ষণের জন্য প্রেরণ করে।


কেএনএফ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালে ইনফেন্ট্রি ও কমান্ডো প্রশিক্ষণের পর তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে ফিরে আসে। শুরুতে তারা নিশ্চুপ থাকে কিছুদিন, এরপর বর্তমানে সক্রিয় হয়েছে। এই সংগঠনের সকল সদস্যই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।

কেএনএফ তাদের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি-চিন রাজ্যে হস্তক্ষেপ ও অনুপ্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারের প্রতি তাদের দাবী পুরণের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, অন্যথায় তারা দাবী আদায়ে সশস্ত্র যুদ্ধে নামবে।

সূত্র মতে, বর্তমানে তাদের সশস্ত্র গ্রুপের সংখ্যা ৩-৪ হাজার, যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিজোরামে সক্রিয় রয়েছে।


পার্বত্য নিউজের অনুসন্ধান বলছে, বর্তমান কেএনএ’র সশস্ত্র সদস্যদের প্রশিক্ষণের মেয়াদ তিন মাস। এরমধ্যে একমাস মিজোরামে তাত্ত্বিক ও শারিরীক প্রশিক্ষণ দেয়া হয় এবং বাকি দুইমাস মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপের সাথে মিয়ানমার আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এ ধরণের প্রশিক্ষণে সংগঠনের ২০ জনের বেশি সদস্য মিয়ানমার আর্মির সাথে যুদ্ধে মারা গেছে। সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কেএনএ‘র প্রতিটি সদস্য সামরিক কৌশলে উচ্চতর দক্ষতা সম্পন্ন ও যুদ্ধংদেহী। এ ছাড়াও তাদের কাছে রয়েছে ভয়ানক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র।

সূত্র মতে, বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলার কেওক্রাডং পর্বতের কাছাকাছি এলাকায় তাদের গোপন আস্তানা থাকলেও এর অধিকাংশ সদস্য বর্তমানে সিভিল লাইফে ছদ্মবেশে রয়েছে কেন্দ্রীয় নির্দেশের অপেক্ষায়। মাঝে মাঝে বিভিন্ন প্রয়োজনে তারা খুবই স্বল্প সময়ের জন্য লোকালয়ে আসলেও দ্রুতই আস্তানায় ফিরে যায়।


কেএনএফ বর্তমানে স্যোশাল মিডিয়ায় তারা নিয়মিত তাদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের নানা ছবি ও ভিডিও আপলোড করে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে জেএসএসইউপিডিএফ এর বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্রগোষ্ঠী থাকলেও কেএনএ’র মতো এভাবে সশস্ত্র গ্রুপের ঘোষণা দিতে দেখা যায় না। এতো দিন স্যোশাল মিডিয়াতে বার্মিজ বিদ্রোহীদের প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধের যেসব ভিডিও দেখা যেত, এই গ্রুপের ভিডিও’র সাথে তার মিল রয়েছে। কাজেই এখন থেকেই সরকারকে এ ব্যাপারে সচেতন ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে একদিন দেশকে কঠিন মূল্য দিতে হবে বলে সচেতন পার্বত্যবাসী মনে করে।

তথ্য সূত্রঃ পার্বত্য নিউজ

মন্তব্য করুন: