• রাঙামাটি

  •  শুক্রবার, আগস্ট ১৯, ২০২২

সম্পাদকীয়

কেএনএফ-জেএসএস’র অপত্য কোষ, তাই এত ভয়!

 আপডেট: ১২:২৬, ৬ জুলাই ২০২২

কেএনএফ-জেএসএস’র অপত্য কোষ, তাই এত ভয়!

​​​​​​​ছবি- জেএসএস ও কেএনএফ’র লগো।


তিন পার্বত্য জেলার ৯টি উপজেলা নিয়ে পৃথক রাজ্য প্রতিষ্ঠা ও পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবীতে সম্প্রতি সশস্ত্র সংগঠন হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। পাহাড়ের বম, পাংখুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং এই ৬টি সম্প্রদায়কে অনগ্রসর ও শান্ত স্বভাবের সম্প্রদায় হিসাবে গণ্য করা হলেও এবার এদের মধ্য থেকেই অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া হয়েছে। ৪৭-এর উপ-মহাদেশের বিভক্তি ও ৭১ পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সশস্ত্র আন্দোলনের ফলে পার্বত্য জেলা ছেড়ে ভারতের মিজোরাম, লংত্লাই, লুংলেই ও মামিট জেলায় দেশান্তরি হয় খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এই সম্প্রদায়ের অনেকে। তাদের অনেকে এখন আর্থিক সহায়তা ও সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমে এই কুকি-চিন রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনে নেমেছে।

জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-খন্ড নিয়ে ‘কুকি-চিন রাজ্য’ নামে একটি পৃথক রাজ্যের দাবিতে (কেএনএফ) এবং এর সশস্ত্র শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) মনে করে, পাহাড়ের ৯টি উপজেলা তাদের পূর্ব-পুরুষদের আদিম নিবাস, ব্রিটিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দখলদাররা অনুপ্রবেশ করে এবং এই ভূমি দখল করে নেয়, ফলে তারা সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এ সংগঠনের সভাপতি নাথান বম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর পাস করে। জেএসএস এর ছাত্র সংগঠন পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) ঢাকা মহানগর শাখা ও কেন্দ্রিয় কমিটি’র একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। খাগড়াছড়ির চেঙ্গী স্কোয়ারের পাশে এম এন লারমার ভাস্কর্যটির অন্যতম কারিগর ছিলেন। কুকি-চীন জাতীয় ডেভ লপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কুকি-চিনভূক্ত জাতিগোষ্ঠীর পরিচিতি নিয়ে ‘দ্য বমজৌ’ বইসহ ৬টি বই প্রকাশ করেন এবং বম সম্প্রদায় থেকে প্রথমবারের মতো ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র হিসাবে প্রার্থী হয়েছিলেন।

কেএনএফ-এর দাবী মতে, রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বান্দরবান উপকন্ঠ থেকে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো অঞ্চল হয়ে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানছি, লামা ও আলীকদম মোট ৯টি উপজেলা নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি পৃথক রাজ্য সৃষ্টি করা তাদের দাবি।

সম্প্রতি নিজেদের ফেসবুকে পেজের মাধ্যমে সরকারের কাছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীর কর্তৃক ৩ হাজারেরও বেশী ম্রো গণহত্যাসহ পাংখোয়া ও বম জনগোষ্ঠীদের উপর গুম, অপহরণ ও হত্যা এবং ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যার বিচার দাবি করে কেএনএফ। 

বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের কুকি-চিন জনগোষ্ঠী (বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং) সবচেয়ে অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত। সুদীর্ঘ বৎসর ধরে বৃহত্তর পাহাড়ি জনগোষ্ঠিদের থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে লাঞ্চনা-বঞ্চনা শিকার হয়ে আসছে। সশস্ত্র গ্রুপগুলো তাদের অঞ্চলে গুম, অপহরণ ও হত্যাকান্ড সহ কুকি-চিন জনগোষ্ঠির উপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। সেই সকল নিস্কৃতি পেতেই এ কুকি-চিন জনগোষ্ঠীদের কতিপয় উচ্চশিক্ষিত মহল সরকার এবং জেএসএসদের মধ্যকার পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের অব্যবহিতপরই জেএসএস চাকমাদের আঞ্চলিক পরিষদ গঠন এবং আত্মসমর্পণের পর তাদের পূনঃ সশস্ত্র সংগ্রামের রাজনৈতিক মতাদর্শ বিরোধিতা করে এসেছিল। এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ পৃথক রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনের নেতৃত্ব দেন নির্যাতিত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষিত নাথান বম। 

কেএনএফ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে এরূপ জানা যায়, নাথান বম, ম্রো ও খুমি নেতাগণ সহ অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর সচেতন ও সুশিক্ষিত মহলের নেতৃত্বে ২০০৮ সালে কুকি-চিন ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও)এর নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটি সরকারের সমাজকল্যান মন্ত্রনালয়ের অধীনে সমাজসেবা অধিদপ্তরে লাইসেন্সপ্রাপ্ত।

এসময় পাহাড়ে অনগ্রসর প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীকে শান্তি ও সম্প্রীতি কর্মসূচীর আওতায় সহায়তার অংশ হিসেবে ২০১৩ সালের ১০ই নভেম্বর রুমাতে সামাজিক সংগঠন হিসেবে এর অফিস নির্মান ও উদ্ধোধন করেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন বান্দরবান ব্রিগেড কমান্ডার। ২০১৫ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন চট্টগ্রাম ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি বান্দরবানের রুমা সফরকালে নেই অফিসটি উদ্বোধন করেন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর নারীদের জন্য পাহাড়ের অন্যান্য সব উপজেলা মতো সেলাই প্রশিক্ষন কেন্দ্র ও বেকার যুবকদের কল্যানে কম্পিউটার প্রশিক্ষন কেন্দ্র নির্মানের ঘোষনা দেন।

কিন্তু এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে এবং রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য কেএনএফ কে নিয়ে নিরাপত্তাবাহিনীকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালায় জেএসএস ও ইউপিডিএফ সন্ত্রাসীরা। এছাড়া কেএনএফ কে ইসলামিক জঙ্গীগোষ্ঠীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত বলা হলেও আদতে কেএনএফ এর সদস্যরা তথা বম জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সেখানে ইসলামিক  কোন জঙ্গীগোষ্ঠীর গন্ধ থাকাও অবান্তর ধারনা।

এদিকে, সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস এর নড়েচড়ে বসার ঘটনায় পরিলক্ষিত হচ্ছে, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) এর সাম্প্রতিক কর্মকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ে বিশেষ করে রাঙামাটিতে মোটেও সুবিধা করতে পারছেনা জেএসএস সন্ত্রাসীরা। তাদের সাম্প্রতিক সকল অবৈধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে শক্ত দেয়াল দাঁড় করিয়েছে কেএনএফ। ফলে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থানে কেএনএফ নিয়ে নানা অপপ্রচারে শামিল হয়েছে জেএসএস। এছাড়া বিলাইছড়িতে গত ২১ জুন জেএসএস এর গুলিতে তিন গ্রামবাসী নিহত হবার ঘটনাকে উল্টে দিয়েে এ ঘটনায় কেএনএফকে দায়ী করে জেএসএস সাধারণ পাহাড়িদের কেএনএফ এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে পুরনো রাজনৈতিক দাবার গুলি চালান দিয়েছে।

কেএনএফ সূত্র মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ) একটি শান্তিপূর্ণ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সংগঠন। কেএনএফ ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীকে তাদের শত্রু মনে করেনা। কেএনএফ-এর সশস্ত্র শাখা কেএনএ ত্রিপুরাদের চিহ্নিত করে বা পূর্ব পরিকল্পনা করে হামলা চালায়নি। কেএনএ'র মতে, জেএসএস সন্ত্রাসীদের দ্বারা কেএনএফ-এর ক্যাম্প আকস্মিক আক্রান্ত হলে তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ হিসেবে জেএসএস সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর আস্তানায় হামলা চালিয়েছে। পলায়নপর সন্ত্রাসীর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকেও কেএনএ সদস্যরা অকস্মাৎ প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়েছে। কিন্তু অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে জেএসএস নেতারাই কেএনএফ-এর বিরুদ্ধে উল্টোভাবে শিশুটিকে ব্যবহার করে সর্বক্ষেত্রে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

এদিকে, কেএনএফ এর সাথে সশস্ত্র সংঘাতে গত কয়েকদিনে বেশ কয়েকজন সামরিক কমান্ডারসহ নেতা-কর্মী হারিয়ে এবার কেএনএফ এর প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে সন্তু লারমার জেএসএস। মূলত পাহাড়ে উপজাতি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসীরা চাঁদাবাজি, অপহরণ করে অর্থ আদায়, পাহাড়ি-বাঙালিদের মধ্যে শান্তি বিনষ্টসহ নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত। এছাড়া ধর্মের নামেও নানা অপকর্ম করছে। দেশে-বিদেশে নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। বছরের পর বছর এসব চাঁদাবাজ ক্যাডারদের কাছে জিম্মি হয়ে আছে পাহাড়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। স্থানীয় হাটে-বাজারে সামান্য কলা বিক্রি করতে গেলেও এসব সন্ত্রাসী সংগঠনের নেতাদের চাঁদা দিতে হয়। সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করলে সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর উপর দোষ চাপায়। এমনকি তারা নিরাপত্তাবাহিনীর পোশাক পরেও অপকর্ম চালায়। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে কথিত এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীও নানা অপপ্রচারে লিপ্ত।

যখনই কেএনএফ জেএসএস এর অবৈধ চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন সহ নানা অপরাধের বিষয়ে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করেছে ঠিক তখনই কেএনএফ নিয়ে আপ্রচারে মেতেছে সন্তু লারমার জেএসএস।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপত্তাবাহিনীর কারণে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো মাথাচাড়া দিতে পারে না। নিজেদের ইচ্ছেমতো অপরাধের রাজত্ব কায়েম করতে পারে না। তাই তারা পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে কাজ করা নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে দিনরাত নানা অপপ্রচার করেই চলছে। যেখানে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করে, সেখানে নিরাপত্তাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে সন্ত্রাসীরা অপকর্ম করে নিরাপত্তাবাহিনীর উপরই দোষ চাপায়। অথচ নিরাপত্তাবাহিনীর থাকার কারণে পাহাড়ে সকল ধর্মের মানুষ সহাবস্থান করতে পারছে। আর কেএনএফ প্রতিদ্বন্ধী হয়ে ওঠায় এবং তাদের সাথে শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে কেএনএফ এর যোগসূত্র খোঁজার বাহানায় রাষ্টকে নিয়েই অবাক মিথ্যাচারে লিপ্ত হয়েছে জেএসএস।

মূলত পাহাড়ে জাতিগত বৈষম্য এবং বিভেদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করে চলেছে জেএসএস। এরই ধারাবাহিকতায় জেএসএস কর্তৃক পাহাড়কে উত্তপ্ত করার ব্যর্থ প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকলের উচিত জেএসএস এর এই ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করা।

মন্তব্য করুন: