• রাঙামাটি

  •  রোববার, অক্টোবর ২, ২০২২

সম্পাদকীয়

যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের জন্ম দিলো পিসিজেএসএস!

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ-

 আপডেট: ১১:৫৩, ২ সেপ্টেম্বর ২০২২

যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের জন্ম দিলো পিসিজেএসএস!
ফাইল ছবি 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পুরো জাতি যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যস্ত তখন পার্বত্য অঞ্চলের উপজাতীয়দের স্বার্থ আদায়ের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে গঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। জনসংহতি সমিতির সহযোগী সংগঠন ছিল এর সামরিক শাখা শান্তি বাহিনী। এমএন লারমা শান্তি বাহিনী নামে এই সশস্ত্র শাখা গঠন করেন ১৯৭৩ সালে। 

জনসংহতি সমিতির নৈতিক আদর্শ ও উদ্দেশ্য ছিল: মানবতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, মুরং, পাঙ্খো, খুমি, চাক, খিয়াং, লুসাই প্রভৃতি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার অর্জন।

পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি বাহিনীর সামরিক অপতৎপরতা: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হলে মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা ভারতে আত্মগোপনে চলে যান এবং ১৯৭৬ সাল থেকে শান্তি বাহিনী পার্বত্য অঞ্চলে সামরিক অপতৎপরতা শুরু করে। কিন্তু এমএন লারমা চীনাপন্থী কমিউনিজমে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং তার সহযোদ্ধা ও অনুসারীরা সকলেই একই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। এর মধ্যে শান্তিবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রীতি কুমার চাকমা চীনাপন্থী কমিউনিজমের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলেন। যে কারনে জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই অভ্যন্তরে দুটি মতাদর্শ বিদ্যমান ছিল। 

এমএন লারমার একচোখা নীতি: এমএন লারমা তখন একচোখা নীতির উপর ভিত্তি করে তখন তার ছোট ভাই সন্তু লারমাকেই সামরিক শাখা শান্তি বাহিনীর ফিল্ড কমান্ডারের দায়িত্ব দেন। পরবর্তীতে সন্তু লারমাকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে বসান। যে কারণে এমএন লারমার প্রতি স্বজনপ্রীতির গুরুতর অভিযোগ তুলেন শান্তি বাহিনীর শীর্ষ নেতাসহ তার  অনুসারীরা।

একদিকে মানবেন্দ্র লারমার নেতৃত্বাধীন বামপন্থী লারমা গ্রুপ, অন্যদিকে প্রীতিকুমার চাকমার নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী প্রীতি গ্রুপ। ১৯৮২ সালের ২৪ অক্টোবর আদর্শগত সংঘাত থেকে শান্তি বাহিনীর সামরিক শাখা দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। 

এম এন লারমা। ফাইল ছবি

এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট: উৎপল খীসা তার দ্বিতীয় বইয়ের অধ্যায়ের শিরোনাম ‘দুই ষাঁড়ের উন্মত্ত দৌড় প্রতিযোগিতা’ দিয়ে বইয়ে লিখেছেন ‘প্রীতি চাকমা ও সন্তু লারমা’র উন্মত্ত দৌড় প্রতিযোগিতা থামাতে যথার্থ নেতার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছিলেন এম এন লারমা। এরই মধ্যে ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ সালে সীমান্তের ওপারে ইমারা গ্রামের বাঘমারা নামক স্থানে শান্তিবাহিনীর কল্যাণপুর ক্যাম্পে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে নির্বিঘ্নে হত্যা করতে প্রীতি চাকমাকে মীরজাফরদের মতন সহায়তা করেছিলেন খোদ সন্তু লারমা। তাই এটা ধ্রুব সত্য যে, এম এন লারমাকে হত্যায় প্রীতি চাকমা এবং সন্তু লারমা উভয়ই সম্পৃক্ত এবং দায়ী। এই হত্যাকান্ডের মূল উদ্দেশ্যে ছিলো জনসংহতি সমিতির দায়িত্ব নিজের করে নেয়া এবং তাতে পুরোপুরি সফল হয়েছিলেন সন্তু লারমা। একজন নিজের ক্ষমতার রাস্তা পরিষ্কার করতে হত্যা করেছেন, আরেকজন নিজের ক্ষমতার রাস্তা পরিষ্কার করতেই উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বহু নজির খুঁজে পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র- ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ স্বপ্নের অপমৃত্যু, উৎপল খীসা:- দুই ষাঁড়ের উন্মত্ত দৌড় প্রতিযোগিতা: পৃ. ১৭’ ৬০’

সন্তু লারমার ক্ষমতা গ্রহণ:- এমএন লারমা হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর ছোট ভাই সন্তু লারমা জনসংহতি সমিতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালের এপ্রিলে প্রীতি চাকমা গ্রুপের ২৩৬ জন সদস্য সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করলে প্রীতি গ্রুপের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়। অবশ্য প্রীতি কুমার চাকমা আত্মসমর্পণ করেন নি।

শান্তি চুক্তির পর জেএসএস’র অধপতন: শান্তি বাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণ ও জেএসএসকে রাজনীতির মূল ধারায় ফিরিয়ে আনার জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র জমা দেয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সন্তু লারমা নিজেও সরকারের সদিচ্ছার প্রতি পূর্ণ আস্থা স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়ে নিজ সমর্থক শান্তিবাহিনীর একাংশকে জঙ্গলেই অপেক্ষাকৃত ভারী ও আধুনিক অস্ত্রসহ রেখে আসেন। অর্থাৎ শুরুতেই শান্তিবাহিনীর একটি অংশ অস্ত্র সমর্পণ করেনি। এমনকি সন্তু লারমার সাথে সম্পাদিত চুক্তির সময় বিরোধিতা করে তখন জন্ম নেয় প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফ।

তথ্যসূত্র- ‘ফিরে দেখা শান্তি বাহিনীর গৃহযুদ্ধ স্বপ্নের অপমৃত্যু’, উৎপল খীসা:- দুই ষাঁড়ের উন্মত্ত দৌড় প্রতিযোগিতা: পৃ. ১৭’ এবং ৬০’

অন্তকোন্দল থেকে দল ও উপদলে বিভক্তি: জেএসএস সন্তু লারমা ও ইউপিডিএফ প্রসীত দল উপজাতিদের স্বার্থ আদায়ের কথা বলে প্রতিযোগিতামূলকভাবে দরিদ্র পাহাড়ি-বাঙালীদের কাছ থেকে চাঁদা উত্তোলন, গুম খুন-নির্যাতন শুরু করে। চাঁদার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত চরম আকার ধারন করলে ২০০৭ সালে ইউপিডিএফ ভেঙে হয় গঠিত হয় ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জেএসএস ভেঙে জন্ম নেয় জেএসএস (সংস্কার)। এসব সংগঠনের নেতারা উপজাতিদের অধিকার আদায়ের ভূলি মুখে আওড়ালেও মূলত বেপরোয়া চাঁদাবাজি, গুম, খুনসহ লিপ্ত রয়েছে ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতে।

বছরে ৪০০ কোটি টাকার চাঁদাবাজি ও ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে অন্তত ২৫’শ মানুষ খুন ও ১৫শ’ জন গুম; এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ‌‌‘চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদা ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজার মানুষ খুনসহ অন্তত ১৫শ’ জন গুমের শিকার হয়েছেন। 

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, পরিবহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জুমের ফসল এমনকি পাহাড়ে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ৪শ’ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে জেএসএসসহ ৪টি আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। এর মধ্যে শুধু ‘২০২০ সালেই রাঙামাটি থেকে ১৩৯ কোটি টাকা, খাগড়াছড়ি থেকে ১২২ কোটি টাকা, বান্দরবান থেকে ১১৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় করেছে। 

এখানে উল্লেখ্য যে, ‘কে এই অগাস্টিনা চাকমা? সন্তু লারমার সাথে তার সম্পর্ক কি? শিরোনামে গত ০২ মে-২০২২ একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ‘আলোকিত রাঙ্গামাটি’। সেখানে তথ্য-প্রমাণসহ ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জিইয়ে রেখে কিভাবে সন্তু লারমা কিভাবে আত্মীয় স্বজন নিরাপদে বিদেশে কানাডায় রেখেছেন। এমনকি কানাডায় বসবাসরত মেয়ে ও নাতি অগাস্টিনা চাকমার নিকট পাহাড় থেকে উত্তোলিত চাঁদাবাজির টাকা পাচার করছেন এবং সেসব টাকায় তার মেয়ে-নাতনি কেমন বিলাস বহুল জীবন যাপন করছেন।”

ভিডিও লিংক:-  ‘কে এই অগাস্টিনা চাকমা? সন্তু লারমার সাথে তার সম্পর্ক কি?

পাহাড়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে বাঁধা জেএসএস: শান্তিচুক্তি সন্তু লারমার কাছে অনেকটা সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসের মতো। কারণ, সরকার যেখানে পাহাড়ের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন নতুন সড়ক-ব্রিজ নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, কুটির শিল্প, পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করছে সেখানেও জেএসএস’র নিয়োজিত সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা চাঁদা আদায় করছে। এমনকি পাহাড়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ ও রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনেও বাঁধা প্রদান করেছিলো জেএসএস।

পৃথিবীর ইতিহাসে নিজেদের উন্নয়নকে এভাবে পেছনে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন নজির বিশ্বের আর কোথাও নেই। তাই পাহাড়ে বসবাসরত সাধারণ উপজাতীয়দের প্রশ্ন আমাদের অধিকার আদায়ের নামে পাহাড়ে গুম খুন-চাঁদাবাজি ও ভ্রাতৃঘাতি সংঘাতের জন্ম দিয়ে পিসিজেএসএস’র তথাকথিত আন্দোলন কি সঠিক পথে আছে?

মন্তব্য করুন: