• রাঙামাটি

  •  বুধবার, মে ২৫, ২০২২

রাঙ্গামাটি

দূর্গম হরিনছড়াবাসী বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে

মোঃ নজরুল ইসলাম লাভলু

 প্রকাশিত: ১২:২৩, ২৬ জানুয়ারি ২০২২

দূর্গম হরিনছড়াবাসী বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে
হরিনছড়ায় একটি মাত্র টিউবওয়েল আমতলী পাড়া থেকে পানি সংগ্রহ করছে এলাকাবাসী। 

কাপ্তাই উপজেলা সদর থেকে সড়ক পথে প্রায় ১৫ কিঃমিটার যাওয়ার পর জেটিঘাট হতে ট্রলারযোগে প্রায় নৌপথ পেরিয়ে গেলেই কাপ্তাই হ্রদের পাশেই হরিনছড়া ৩নং ওয়ার্ডের আমতলী পাড়া। আমতলী পাড়া থেকে আধঘণ্টার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েই পৌঁছাতে হয় আমতলী পাড়ায়।

জীর্ণশীর্ণকায় পাড়ার সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি তেজাং তঞ্চঙ্গ্যার (৯০) ঘরেই কথা হয় তার সাথে। তিনি জানান, তাদের এলাকার সবচেয়ে বড় কষ্ট বিশুদ্ধ পানির সংকট। প্রায় ১ হাজার ফুট নীচ থেকে ঝিরির পানি এনে খাওয়া এবং নিত্য নৈমিত্তিক কাজ সারতে হয়। এ সময় তার সাথে যোগ দেয় এলাকার আরেক প্রবীন ব্যক্তি ধন মোহন তঞ্চঙ্গ্যা।

তারা উভয়ে জানান, এই ৩নং ওয়ার্ডের সবচেয়ে নীচের পাড়া আমতলী পাড়াতে একটি মাত্র টিউবওয়েল আছে। যেখান থেকে এক কলসি পানি আনতে প্রায় একঘন্টা সময় লাগে। বিশেষ করে উঁচু পাহাড় বেয়ে নেমে পানি আনতে ভীষণ কষ্ট হয়। আবার এই ঝিরির পানি পান করে অনেক সময় নানা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হতে হয় তাদের।

এই নতুন পাড়া পার হয়ে আরো প্রায় এক কিঃ মিটার গিয়ে উঁচু-নীচু পাহাড় পার হয়ে পৌঁছাতে হয় পাংখোয়া পাড়ায়। ১৮টি পাংখোয়া পরিবার ও ৪টি তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের বসবাস এ পাড়ায়। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১শ' ফুটের উর্ধ্বে অবস্থিত এই পাড়া। প্রকৃতি যেন আপন মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়েছে এই এলাকাকে। অনিন্দ্য সুন্দর পাহাড়, কাপ্তাই হ্রদ আর সবুজ বন বনানী দিয়ে ঘেরা এইপাড়া। কিন্তু এই সুন্দরের মাঝে লুকিয়ে আছে এখানকার পাহাড়ী জনগণের শত বছরের দুঃখ, বেদনা ও কষ্টের ইতিহাস। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ভুগছে এই পাড়াবাসী।

এপাড়া হতে প্রায় আড়াই কিঃ মিটার দুরত্বে অবস্থিত আমতলী পাড়ায় গিয়ে আনতে হয় খাবার পানি। সময়, কষ্ট সব মিলে এক কলসির পানির জন্য পার করতে হয় দুই ঘন্টার উপর সময়। এমতাবস্থায় আশেপাশের ঝিরি থেকে অনেকে পানি এনে পানি পান করে থাকে।

এই পাংখোয়া পাড়ার কার্বারী আরদৌ লিয়ানা পাংখোয়া জানান, ৩নং ওয়ার্ডের হরিনছড়া নতুনপাড়া, হরিনছড়া বেচারাম কার্বারী পাড়া, আমতলী পাড়া ও দুছড়ি পাড়ায় পাংখোয়া, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, চাকমা সহ মোট ১শ' ২০টি পরিবারের বসবাস। জনসংখ্যা প্রায় ৪ শ'য়ের কাছাকাছি। সবচেয়ে নীচে আমতলী পাড়ায় একটি মাত্র টিউবওয়েল আছে, যা থেকে সকলে পানি সংগ্রহ করে। তবে সবচেয়ে দূরবর্তী পাড়া পাংখোয়া পাড়া আর নতুন পাড়ার বাসিন্দাদের কি পরিমাণ কষ্ট হয় তা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না। 

৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য নবীন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা এবং ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ভানুমতি চাকমা জানান, এই পাড়ার বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় সংকট, বিশুদ্ধ পানির তীব্র অভাব।

তিনি জানান, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে অনেক উঁচু স্থান হওয়ায় এখানে গভীর নলকূপ স্থাপন করেও পানির স্তর পাওয়া যায় না। ফলে অনেক নীচে অবস্থিত আমতলী পাড়ার একটি মাত্র টিউবওয়েল বা ঝিরির পানি এলাকাবাসীর একমাত্র ভরসা।

১১৯নং ভাইজ্যাতলি মৌজার হেডম্যান থোয়াই অং মারমা বলেন, দিনদিন বন উজাড় করার ফলে এসব এলাকায় পানির স্তর নীচে নেমে গেছে।

৪নং কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আবদুল লতিফ জানান, ইউনিয়ন পরিষদ এবং বিভিন্ন এনজিও থেকে এই এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করার চেষ্টা করার পরও পানির লেয়ার না পাওয়া তা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি ওই এলাকায় সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করতে যায়, কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনতাসির জাহান। এ সময় এলাকার হেডম্যান, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় জনগণ তাকে পানির এই সংকটের কথা জানান।

এ সময় তিনি উপস্থিত সংবাদকর্মীদের জানান, আমি নিজে এসে এ বিষয়ে দেখে গেলাম। এলাকাবাসীকে একটি আবেদন করতে বলেছি। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা জনস্বাস্থ্য ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে বসে কিভাবে এই পানির সংকট দূরীভূত করা যায়, সে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন: